দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে জাতীয় দলে খেলতে চায় নাদিরা

মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে একটি ত্রাণের ঘর। ঘরের এক কোণে ঝুলছে স্কুলব্যাগ, আর অন্য পাশে যত্নে রাখা একটি ফুটবল। সেই ফুটবলই বদলে দিয়েছে পিরোজপুরের উত্তর পৈকখালীর কিশোরী নাদিরা আক্তারের জীবন।

দিনমজুর বাবার সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। তবে মাঠে নামলেই নাদিরা হয়ে ওঠে এক দুর্দান্ত লড়াকু ফুটবলার। পায়ের জাদুতে একের পর এক গোল করে দলকে জেতায়, আর দর্শকদের মুগ্ধ করে তার খেলা। 

সম্প্রতি পিরোজপুরে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস–২০২৬’ জেলা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে সবার নজর কাড়ে ভাণ্ডারিয়া উপজেলার নাদিরা। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতির পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতে নেয় সে। এখন তার লক্ষ্য বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের সেরাটা প্রমাণ করা।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ৭ নম্বর গৌরীপুর ইউনিয়নের উত্তর পৈকখালী গ্রামের মো. দুলাল আকন ও শাহিদা আক্তার দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় নাদিরা। সে বর্তমানে ভাণ্ডারিয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা দিনমজুর হওয়ায় সংসারে অভাব লেগেই থাকে। বড় ভাই নাঈম অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে কাজে নেমেছে। মেজ ভাই নাহিদ এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট ভাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

তবে কঠিন বাস্তবতাও হার মানিয়েছে নাদিরার স্বপ্নের কাছে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের সঙ্গে মাঠে খেলতে ভালো লাগত তার। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথমবার স্কুল দলের হয়ে মাঠে নামে। এরপর ধীরে ধীরে ফুটবলই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

গত ৮ মে পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত নকআউট, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচে নাদিরার দাপুটে উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তিন ম্যাচে সে একাই ছয়টি গোল করে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে একের পর এক গোল করে দর্শকদের মুগ্ধ করে সে। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দল ফাইনালে উঠলেও টাইব্রেকারে ২-১ গোলে হেরে যায়। তবে পুরো টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আলো ছড়ায় নাদিরা।

নাদিরার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, প্রতিবেশীদের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় তার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়েছে।

এ বিষয়ে নাদিরা দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘আমার খুব ইচ্ছা দেশের হয়ে জাতীয় নারী ফুটবল দলে খেলব। কিন্তু আমাদের পরিবারের অবস্থা ভালো না। বাবার পক্ষে কোচিং করানো সম্ভব না। যদি ভালো প্রশিক্ষণ আর একটা সুযোগ পাই, তাহলে অনেক দূর যেতে পারব।’

নাদিরার বাবা দুলাল আকন বলেন, ‘আমার স্বপ্ন মেয়েটা একদিন দেশের হয়ে খেলবে। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ, দিনমজুরি করে সংসার চালাই, ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়ার সামর্থ্য নেই।’

ক্রীড়া শিক্ষক বুশরা আক্তারের ভাষায়, ‘নাদিরা প্রতিভাবান। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার আত্মবিশ্বাস অনেক শক্ত। প্রয়োজন শুধু সঠিক প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা।’

ভাণ্ডারিয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মনির হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘গ্রামের একটি মেয়ের এমন অর্জন আমাদের গর্বিত করেছে। তার প্রতিভা ধরে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরি।’

বর্তমানে নাদিরা আক্তার বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসকে সামনে রেখে পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামে অনুশীলন করছে।