করমজলের লাল মাছরাঙা

বিরল ও দুর্লভ কিছু পাখির সন্ধানে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শেষদিন বিকেলে করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে এসে পৌঁছলাম। ঘন কুয়াশার কারণে পক্ষীর খাল অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় করমজল পৌঁছতে বেশ দেরি হয়ে গেল। ফলে হাতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় পেলাম। যদিও করমজলে সবসময়ই দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় থাকে, কিন্তু এখানকার মতো এত প্রজাতির পাখি অন্য কোথাও দেখা যায় না। তাই সময় নষ্ট না করে হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র পার হয়ে দ্রুত সিমেন্টের পাকা ট্রেইলে উঠে গেলাম। সুন্দরবনের বেশির ভাগ স্থানেই আমরা নৌকাযোগে খাল বা খাঁড়িতে গিয়ে পাখি পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু করমজলে পাকা ট্রেইলে হেঁটে হেঁটেই ছবি তোলা যায়।

ট্রেইলে উঠে প্রথমেই একটি কম বয়সী খোঁপাবাজের দেখা পেলাম। দ্রুত ওর ছবি তুলে সামনের দিকে এগোলাম। কিছুক্ষণ এগোনোর পর হালকা নীল রঙের নীলাম্বরীর দেখা পেলাম। ওর ছবি তুলতে তুলতেই অতি চঞ্চল একঝাঁক ছোট সহেলির দেখা মিলল। চঞ্চল পাখিগুলোর ছবি তুলতে তুলতে শীতের দিনেও ঘামে নেয়ে উঠলাম। তবে ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন পাখির ছবি তুললেও আমাদের সবার চোখ কিন্তু টকটকে লাল রঙের ড্যাগারের মতো ঠোঁটের একটি পাখিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। দুর্লভ পাখিটির ছবি ইতিপূর্বে কটকার জামতলী ও কটকা খাল এবং কোকিলমনির আগুনজ্বলা বা ক্ষেতখেরা খাল থেকে তুললেও করমজলে কখনোও ওর দেখা পাইনি। এমনিতেই সময় কম, তারপর বিভিন্ন পাখির ছবি তুলে ইতিমধ্যেই ৪৫ মিনিট সময় শেষ করে ফেলেছি। হাতে সময় আর মাত্র ১৫ মিনিট। হঠাৎ দলের কেউ একজন একটি গেওয়া গাছের মাটির কাছাকাছি ডালের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করতেই একসঙ্গে ছয়-সাতটি ক্যামেরার শাটারের শব্দে পুরো বাদাবন যেন কেঁপে উঠল। বিকেল ৩টা ৪৩ থেকে ৫৫ মিনিট পর্যন্ত এই ১২ মিনিটে ২৬৫টি ছবি তুললাম। নির্দিষ্ট সময়ে অভিযান শেষ করে ছোট লঞ্চ ‘আলোর কোল’-এ উঠে মঙ্গলার দিকে রওনা হলাম। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর বিকেলের ঘটনা এটি।

করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে দেখা ড্যাগার ঠোঁটের লাল পাখিটি এদেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি লাল মাছরাঙা। লালচে বা রাঙা মাছরাঙা নামেও পরিচিত। লাল মাছরাঙার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে অনেকে এটিকে পাহাড়ি লাল নামেও ডাকে। ইংরেজি নাম জঁফফু করহমভরংযবৎ। অ্যালসিডিনিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঐধষপুড়হ পড়ৎড়সধহফধ (হ্যালসিওন করোম্যান্ডা)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন ও জাপানে ওর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

লাল মাছরাঙা দৈর্ঘ্যে ২৫-২৭ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৬০ থেকে ৯২ গ্রাম। একনজরে পাখিটির রঙ টকটকে লাল। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও পিঠের রঙ গাঢ় লাল। গলা, বুক ও পেট হালকা লাল। কোমর হালকা নীল। ঠোঁটের গোড়া কালচে-লাল ও অগ্রভাগ ফিকে লাল। চোখ কালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা প্রবাল-লাল। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও পুরুষগুলো দেখতে বেশি উজ্বল। কমবয়সী পাখির দেহের ওপরটা কালচে-বাদামি। দেহের নিচটা লাল ও তাতে কালচে ডোরা থাকে। কোমর ও লেজের ওপরের ঢাকনি গাঢ় নীল। ঠোঁট কালচে, যার অগ্রভাগ কমলা-লাল।

এটিই একমাত্র মাছরাঙা যে সুন্দরবনের জলাশয় বা খালের আশপাশে বাস করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। পানির উপরে ও কাদার মধ্যে শিকার খোঁজে। মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, বড় বড় পোকামাকড় ইত্যাদি বেশ পছন্দ করে। দ্রুত ও জোরে ডানা চালিয়ে সোজাসুজি উড়ে। তীব্র ও কাঁপা স্বরে ‘টি-টি--টি-টি-টি---’ শব্দে ডাকে। প্রজননকালে মনোরম ‘কুয়িররর-র-র-র-র---’ কণ্ঠে গান গায়।

মার্চ থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় খালের খাড়া পাড় বা গাছের ডালে ৪৫-১০০ সেন্টিমিটার লম্বা গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। স্ত্রী তিন থেকে-চারটি চকচকে ঘিয়ে রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১৭-২২ দিনে। দুর্লভ এই পাখির ছানাগুলো একসময় বড় হয়ে নীল আকাশে ডানা মেলে। আয়ুষ্কাল সাত থেকে আট বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়