গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য আইনের অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের বৈঠকে এই দাবি জানানো হয়। সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করে। সম্পাদক পরিষদ জানায়, গণমাধ্যমবিষয়ক আইনগুলো অনেক পুরনো এবং এগুলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এগুলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
প্রধানমন্ত্রীকে তারা জানান, পত্রিকা প্রকাশের ঘোষণাপত্রের ফর্ম ‘বি’তে প্রকাশকদের ঘোষণা ও সই দিয়ে বলতে হয়, ‘আমি, এই মর্মে আরও ঘোষণা করিতেছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পরিপন্থি বা কোনো আপত্তিকর বিষয় আমার উক্ত পত্রিকায় প্রকাশে বিরত থাকিব এবং ১৯৭৩ সনের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইনের সমুদয় নিয়মাবলী মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিব।’ এ ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে অগণতান্ত্রিক চরিত্র রয়েছে। সম্পাদক পরিষদ এ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
বৈঠকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গণমাধ্যম সংস্কারের জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন অথবা প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়।
সম্পাদক পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তথ্যমন্ত্রীকে আগামী জুন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে জুলাই মাসের মধ্যেই সরকার যেন একটি দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে পারে, সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জোর দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক পরিষদ ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য একটি ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়ন ও গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায় এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের কয়েকজন সদস্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন। সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ অনুসন্ধান ও আইনিপ্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন; কিন্তু হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা জানিয়েছেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষ অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সম্পাদক পরিষদকে আশ্বস্ত করেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক নয়; বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বিশ্বাস করেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অংশ এবং তার সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা হস্তান্তর : হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছেন সম্পাদক পরিষদের নেতারা। বৈঠক শেষে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘২৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলার আসামি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা এই তালিকা দিয়েছি। এই তালিকা যে একেবারেই সম্পূর্ণ, সেটা আমরা বলছি না। অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, কিন্তু আমরা আন্তরিকভাবে এটা দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও এটা গ্রহণ করেছেন। তিনি তথ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন বিষয়টি দেখার জন্য এবং এ ব্যাপারে তারা একটি উদ্যোগ নেবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি, এই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং এত মামলা, গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ভালো নয়। এমনকি সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও ভালো নয়। প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে এটা গ্রহণ করেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।’
এ সময় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সম্পাদক পরিষদের নেতারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী তাদের অনুভূতির সঙ্গে একমত পোষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার গঠন থেকে এ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে কোনো ধরনের কোনো হস্তক্ষেপ সরকার থেকে না থাকায় সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদকম-লীর নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ ও দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাতারের শ্রমমন্ত্রীর সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কাতারের শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সামিখ আল মাররি। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাম্বাসেডর ব্রেক সাঈদ আল-সামিখ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সন্ধ্যায় দুই দিনের সফরে ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছান কাতারের শ্রমমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির কাতারের শ্রমমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে দোহার বাংলাদেশ দূতাবাস কাতারের শ্রমমন্ত্রীর বাংলাদেশে সফর গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেছে, আমরা আশা করি, এই সফর অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হবে এবং কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্বকে সামনের দিনগুলোতে আরও সুদৃঢ় করবে।