কঙ্গোতে ইবোলার প্রাদুর্ভাবে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা

ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে বিরল প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ৮৮ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। তবে এই প্রাদুর্ভাবকে এখনই ‘মহামারী’ হিসেবে ঘোষণা করেনি সংস্থাটি। জেনেভাভিত্তিক এই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গো এবং উগান্ডায় বুন্দিবুগিও ভাইরাসজনিত ইবোলা রোগটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এটি মহামারী পর্যায়ে পৌঁছানোর শর্তগুলো এখনো পূরণ করেনি। এটি ডব্লিউএইচওর সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর। কঙ্গোতে এই বিরল প্রজাতির ভাইরাসের সংক্রমণে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক সতর্কতার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে ডব্লিউএইচও। আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি আফ্রিকা) শনিবার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সংক্রামক এই রক্তক্ষরণজনিত জ্বরে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৩৬টি সন্দেহজনক সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই কঙ্গোর স্বর্ণখনি অধ্যুষিত মঙ্গওয়ালু ও রামপারা শহরের বাসিন্দা। চিকিৎসা সহায়তাকারী সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাবকে তারা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল রজার কাম্বা বলেন, ভাইরাসের এই বুনদিবুগিও ধরনের কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এ ধরনে মৃত্যুর হার অনেক বেশি; আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় গত শুক্রবার একই ভাইরাসে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ওই ব্যক্তি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর নাগরিক ছিলেন। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৫৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে সপ্তাহের শুরুতে রাজধানী কাম্পালার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মৃত্যুর দিনই তার মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা যায়, উগান্ডায় মারা যাওয়া ওই ব্যক্তি ইবোলার বুনদিবুগিও ধরনে আক্রান্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে এই ধরনটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। বর্তমানে কেবল ইবোলার জায়ারে ধরনের জন্য টিকা পাওয়া যায়। এটি ১৯৭৬ সালে শনাক্ত হয়েছিল। ওই ধরনে মৃত্যুর হার আরও বেশি, প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ। সিডিসি আফ্রিকা জানিয়েছে, স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গত শুক্রবার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে নতুন এই প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই প্রদেশের সীমান্ত রয়েছে উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে। এই অঞ্চলে এক দেশের মানুষের অন্য দেশে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এ কারণে ভাইরাসটি আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় নাগরিক প্রতিনিধি আইজ্যাক নিয়াকুলিন্দা এএফপিকে ফোনে বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে মানুষকে মরতে দেখছি। আক্রান্তদের আলাদা করে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা বাড়িতেই মারা যাচ্ছে, আর পরিবারের সদস্যরাই মরদেহ স্পর্শ করছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাম্বা জানান, প্রথম শনাক্ত রোগী ছিলেন একজন নার্স। তিনি গত ২৪ এপ্রিল ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইবোলাসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আসেন। ইবোলার উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, রক্তক্ষরণ ও বমি। এমএসএফের জরুরি কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা, একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এবং সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ পৌঁছে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এক কোটির বেশি জনসংখ্যার ডিআর কঙ্গো আয়তনে ফ্রান্সের প্রায় চার গুণ হলেও দেশটির যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল। ফলে চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ডিআর কঙ্গোতে ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। কর্মকর্তারা বলছেন, সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা রয়েছে।