জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দিলেও আট ঘণ্টা পর খুলে দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আহসান অভিযুক্তকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকের তালা খুলে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও আসামিকে আইনের আওতায় আনতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
জাবির নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও প্রাণনাশ চেষ্টার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় গতকাল বিক্ষোভে নামেন শিক্ষার্থীরা। প্রক্টর কার্যালয়ের পর গতকাল সকাল ১০টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে সেখানে অবস্থান নেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে না পারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। এ ক্ষোভ থেকে গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে তার কার্যালয়ে তালা দেওয়া হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ঘটনার পর ১০০ ঘণ্টার বেশি সময় পার হলেও আসামির কোনো খোঁজ মেলেনি। তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রধান দাবিই হলো অভিযুক্তকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা। এই দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করতেই তারা প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করেছেন।
উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলায় প্রতিবাদ : চলমান আন্দোলনের মধ্যে জাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন তার নিজ বিভাগের (দর্শন) শিক্ষার্থীরা। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের সামনে থেকে একটি সংক্ষিপ্ত মিছিল বের করে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ কর্মসূচি পালন করেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সম্মুখসারির একজন শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যায়িত করা চরম ন্যক্কারজনক ও অগ্রহণযোগ্য। তারা বলেন, এ ধরনের মন্তব্য উপাচার্যের ব্যক্তিগত সম্মানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশার মর্যাদাকেও ক্ষুন্ন করেছে।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী আকাশ বলেন, ‘যিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন, তাকেই ফ্যাসিস্ট বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’
একই ইস্যুতে গতকাল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাবি শাখার দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ অন্তরের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করাকে সত্যের অপলাপ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে ছাত্রদল জানায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং সব ধরনের যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে রয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সচেতন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে পরিচালিত আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়।
বিবৃতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ও সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক এ ধরনের বিভ্রান্তিকর, কুরুচিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।
তদন্ত কমিটি গঠন : শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১২ মে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে বহিরাগত কর্র্তৃক ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশ চেষ্টার ঘটনায় দায়ভার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা ব্যক্তির নিরাপত্তাসংক্রান্ত দায়ভার নিরূপণ করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রদানের জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি প্রশাসনিক সভায় ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সোহেল রানাকে সভাপতি করে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।