আদালতে ‘বনলতা সেন’

মডেলিং, অভিনয় এবং উপস্থাপনা তিনে মিলে মাসুমা রহমান নাবিলা। আয়নাবাজি সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে সফল যাত্রা শুরুর পর থেকেই বড় পর্দার প্রতি একটা ঝোঁক তৈরি হয় তার মনে। তিন বছর আগে ২০২৩ সালে শাকিব খানের বিপরীতে ‘তুফান’ সিনেমায় দ্যুতি ছড়ানোর পর প্রেক্ষাগৃহে দেখা মেলেনি তার। যদিও তুফানের আগে শেষ করা সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’র কাজ শেষ করেছেন। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বারবার তারিখ পেছানোর পর তিনদিন আগে নির্মাতার পক্ষ থেকে জানানো হয় আসন্ন কোরবানি ঈদেই মুক্তি পাচ্ছে সিনেমাটি। এই খবরে দারুণ এক উচ্ছ্বাসে ভাসছেন নাবিলা। সামাজিক মাধ্যমে সিনেমার একটি বিশেষ পোস্টার শেয়ার করে বিষয়টি নিশ্চিত করেন অভিনেত্রী নিজেই। এরইমধ্যে নির্মাতা ও কলাকুশলীরা পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে মাঠেও নেমেছেন।

কিন্ত সবকিছু যখন চূড়ান্ত, ঠিক তখনই এলো এক সংশয়ের খবর। যদিও সিনেমাটি নির্মাণের শুরু থেকেই আইনি জটিলতা পিছু ছাড়ছে না, তবে শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক ও প্রযোজনা সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ; যা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সিনেমা মুক্তির ঘোষণার পরপরই আবারও নতুন সমস্যা তৈরি হওয়ায় এটি বড়পর্দায় আসা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, ‘বনলতা সেন’ সিনেমার সহপ্রযোজক তরুণ মজুমদার আবারও আদালতের দ্বারস্থ হন।

 ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পাওয়া এই সিনেমার সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন তরুণ মজুমদার। তার অভিযোগ, সিনেমার নির্মাণে তিনি ধাপে ধাপে মোট ৬১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু মুক্তির সময় তাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সেন্সর বোর্ডে জমা দেওয়ার সময়ও তার নাম উল্লেখ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। এ বিষয়ে তিনি সেন্সর বোর্ডেও অভিযোগ জানিয়েছেন।

তরুণ মজুমদার বলেন, ‘সিনেমার কাজ শুরুর সময় সবকিছু ঠিক ছিল। সহপ্রযোজক হিসেবে মুক্তি হওয়ার পর সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রথমে ৪০ লাখ পরে আরও ২১ লাখসহ মোট ৬১ লাখ টাকা নিয়েছেন নির্মাতা উজ্জ্বল। পরবর্তী সময়ে আমি সিনেমা নিয়ে কিছু জানতে চাইলে তিনি আমার সঙ্গে টালবাহানা শুরু করেন। এক পর্যায়ে আমি টাকা ফেরত নিয়ে সিনেমা থেকে সরে যেতে চাইলে তিনি তা ফেরত দেননি। এরপর বাধ্য হয়েই আইনি পথে যেতে হয়েছে।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিনেমাটির নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। তিনি জানান, এটি ব্যবসায়িক চুক্তির ভিত্তিতে শুরু হওয়া একটি প্রকল্প। সিনেমা প্রায় শেষ হওয়ার পর সুদসহ টাকা ফেরত দাবি করা হলেও তা সম্ভব ছিল না। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল জানান, ‘সরকারি অনুদানের সিনেমায় অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামই প্রযোজক হিসেবে থাকে। মুক্তির আগেই প্রতারণার অভিযোগ তুলে আদালতে যাওয়া দুঃখজনক।’

এদিকে দুই প্রযোজকের দ্বন্দ্বের খবরে সব উচ্ছ্বাস ভুলে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে নাবিলার মনে। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতার চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। গ্রামীণ চরিত্রটির জন্য নিজেকে উপযুক্ত করতে তাকে তিন দফায় কঠিন অডিশন দিতে হয়েছে। এমনকি চেহারায় বনলতা সেনের চিরায়ত রূপ ফুটিয়ে তুলতে ডায়েট করে ঝরাতে হয়েছে শরীরের বেশ কিছুটা ওজনও। সহপ্রযোজকের এ আইনি পদক্ষেপের কারণে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হলেও নাবিলা অবশ্য ইতিবাচকভাবেই দেখছেন পুরো বিষয়টি। তিনি বলেন, ‘সিনেমাটি মুক্তি নিয়ে শঙ্কা থাকার কথা নয়। আমি যতদূর জানি, সমস্যা সমাধান হওয়ার পরই ঘোষণা ও পোস্টার অবমুক্ত করা হয়েছে। আশা করছি, সঠিক সময়ে পর্দায় আসবে এ সিনেমা।’

 প্রসঙ্গত, গত ১২ এপ্রিল সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে মুক্তির অনুমতিপত্র পেয়েছে ‘বনলতা সেন’ সিনেমাটি। পরিচালক উজ্জ্বল বলেন, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায়। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে কবিতাটির বয়স প্রায় ৯১ বছর। আর ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে। সেই হিসাবে বইটির বয়স এখন প্রায় ৮৪ বছর। প্রায় শতবর্ষী একটি কবিতা এখনো কী দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক এবং আধুনিক! গোটা কবিতাটিই রহস্য ও দর্শনাবৃত। কবিতাটি যেমন মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখে, সিনেমাটিও যেন একইভাবে দর্শককে মোহাবিষ্ট করে রাখতে সক্ষম হয় এটাই এই চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।