অধিনায়কের কথাই আক্রমণাত্মক খেলার আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল লিটনকে

সিলেটের তপ্ত আবহাওয়া আর ফ্ল্যাট উইকেটে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো, আর দ্বিতীয় ইনিংসে রানের পাহাড় গড়ে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়।

ঐতিহাসিক এই জয়ের পেছনে প্রথম ইনিংসে চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে অনবদ্য ১২৬ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন লিটন দাস। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে লিটন জানান, কঠিন সময়ে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দেওয়া টোটকাই তাঁর ব্যাটিংয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

টেল-এন্ডারদের নিয়ে লড়াই করার সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে লিটন বলেন, "সত্যি বলতে, আগের দুটি ইনিংসে বড় রান না পাওয়ায় শুরুতে বাড়তি কোনো চাপ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ কিছু উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম কী করব। তখন অধিনায়ককে জিজ্ঞেস করতেই ও বলল—'আক্রমণাত্মক খেলো, আমাদের রান দরকার।' অধিনায়কের ওই কথাই আমাকে আক্রমণাত্মক খেলার আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। এরপর আমি স্রেফ নিজের শক্তির ওপর ভরসা রাখি।"

লেজসারির ব্যাটসম্যানদের আগলে রেখে সিঙ্গেলস না নেওয়ার কৌশল প্রসঙ্গে লিটন স্পষ্ট করে বলেন, "দুটো বাউন্ডারি মারার পর মনে হয়েছিল এটি টেস্ট ক্রিকেট, আমাকে আরও কয়েক ওভার টিকে থাকতে হবে। আমি যদি তখন অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানদের সুযোগ (স্ট্রাইক) দিতাম, তবে হয়তো আমার স্কোর ৫০ রানেই আটকে যেত। তাই নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে, আমাকেই বেশি বল খেলতে হবে এবং ওদের সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ ওরা নিরাপদ থাকলে, আমিও নিরাপদ।"

টেল-এন্ডারদের নিয়ে খেলা এবং ধীরগতির আউটফিল্ডের কারণে এই সেঞ্চুরিকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরার মর্যাদা দিয়ে লিটন বলেন, "টেল-এন্ডারদের নিয়ে ব্যাটিং করা মোটেও সহজ নয়, বিশেষ করে যখন সব ফিল্ডার বাউন্ডারিতে বাইরে থাকে।"

"দল গড়তে হলে পরিবর্তন আনতেই হবে" — শান্ত

ম্যাচ শেষে দলের মানসিকতার পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক এই জয় নিয়ে কথা বলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন ড্রেসিংরুমের সতীর্থদের। শান্ত বলেন, "সব কৃতিত্ব খেলোয়াড়দের, তারা সত্যিই অনেক কঠোর পরিশ্রম করছে। আমরা দলে কিছু পরিবর্তন এনেছি এবং একটি দল হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। বিশ্ব ক্রিকেটের দিকে তাকালে দেখবেন, নতুন কিছু গড়তে চাইলে আপনাকে পরিবর্তন আনতেই হবে। আমি আশা করি, আমরা যেভাবে খেলছি তা সামনেও ধরে রাখতে পারব।"

সিলেটের কন্ডিশনে বোলারদের পারফরম্যান্স এবং শেষ সারির ব্যাটসম্যানদের অবদান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে অধিনায়ক আরও যোগ করেন, "আমাদের প্রস্তুতি ছিল অসাধারণ। এমন তপ্ত আবহাওয়ায় এবং ফ্ল্যাট উইকেটে আমাদের ফাস্ট বোলাররা দারুণ কাজ করেছে, যা আমরা সবসময় উন্নত করতে চেয়েছিলাম। ব্যাটিংয়ে আজকাল আমাদের দলে চমৎকার কিছু পার্টনারশিপ হচ্ছে এবং শেষ সারির ব্যাটসম্যানরাও অনেক অবদান রাখছে।"

সিরিজ সেরা মুশফিকুর রহিম

দেশের হয়ে খেলাটাই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা — মুশফিকুর রহিম

পুরো সিরিজ জুড়ে ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ‘প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ’ হয়েছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। প্রথম ইনিংসে লিটনের সেঞ্চুরির প্রশংসা করে তিনি বলেন,

'এই জয় সত্যিই অনেক বড় অর্থ বহন করে। প্রথম ইনিংসে লিটনের খেলা ইনিংসটি ছিল এককথায় অসাধারণ এবং ওটিই আমাদের ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিল। আমাদের ড্রেসিংরুমের মনোবল খুব চড়া ছিল এবং আমরা ওর জন্যও খেলতে চেয়েছিলাম। আমাদের বোলাররা একদম নিজেদের বেসিক ধরে বল করেছে এবং সব কৃতিত্ব তাদেরই প্রাপ্য।'

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজেকে কীভাবে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত রাখেন, তার এক আবেগঘন উত্তর দিয়ে মুশফিক বলেন, 'সত্যি বলতে, আমি সুস্থ আছি এবং দেশের জন্য খেলছি—এটাই বড় বিষয়। দেশের হয়ে খেলার সুযোগ সবাই এত সহজে পায় না। এটার জন্য আপনাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, যোগ্যতা অর্জন করতে হবে এবং মাঠের মাঝখানে সেই পরিশ্রমের প্রমাণ দিতে হবে। ঠিক এই কারণেই আমি আমার জীবন উপভোগ করছি।,