বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও নৃত্যচর্চার ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের কাজ ও অবদান সময়ের সীমানা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করেছে। লুবনা মরিয়ম সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নৃত্যশিল্প, গবেষণা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ সবকিছু মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক জীবন গড়ে তুলেছেন। তার কাজের বিস্তার যেমন মঞ্চে, তেমনি চিন্তায়; যেমন শিল্পে, তেমনি সমাজে।
লুবনা মরিয়ম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৪ সালে। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল গভীরভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ। তার বাবা কাজী নুরুজ্জামান ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তি আর মা ড. সুলতানা কামাল একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী। এমন পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজ, ইতিহাস এবং দায়িত্ববোধের সঙ্গে পরিচিত হন। এই প্রেক্ষাপট তার পরবর্তী জীবনের চিন্তা ও কাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
শৈশবের অভিজ্ঞতা তার জীবনকে একটি আলাদা পথে নিয়ে যায়। ছোটবেলায় তিনি প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন এবং দীর্ঘ সময় হাসপাতালে কাটাতে হতো। ফলে স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দ থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। একাকিত্ব ও নীরবতার মধ্যে তিনি বড় হয়েছেন আর এই সময়েই তার ভেতরে গড়ে ওঠে একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসা। তার মা তাকে নাচের সঙ্গে যুক্ত করেন প্রথমে যা তার কাছে মোটেও আকর্ষণীয় ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে মঞ্চের অভিজ্ঞতা, অনুশীলনের ধারাবাহিকতা এবং শিল্পের সঙ্গে একাত্মতা তাকে এই জগতের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে।
নাচের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মঞ্চের অভিজ্ঞতা। প্রথমবার মঞ্চে ওঠার পর তিনি বুঝতে পারেন, এই জায়গাটির ভেতরে এক ধরনের শক্তি রয়েছে, যা একজন মানুষকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করে। সেই মুহূর্ত থেকেই নাচ তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তার নিজের ভাষায়, দক্ষতা জন্মগত নয়; পরিশ্রম এবং অনুশীলনের মাধ্যমেই তা গড়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবনে তিনি বুয়েটে স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময় সেই পড়াশোনা ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে নৃত্যকলার দিকে মনোনিবেশ করেন। এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না, তবে তার ভেতরের শিল্পীসত্তা তাকে এই পথেই এগিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময় তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য বিদেশে যান এবং সেখান থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও প্রসারিত করে এবং তাকে একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ না করলেও শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছেন, অসুস্থ মানুষদের সেবা করেছেন এবং শিশুদের শিক্ষাদানে যুক্ত ছিলেন। তার পরিবার সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিল, ফলে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার কাছে খুবই ব্যক্তিগত এবং গভীর। এই অভিজ্ঞতা তার শিল্পচিন্তাকে প্রভাবিত করে এবং তাকে সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করে।
নৃত্যচর্চার ক্ষেত্রে তিনি শুরুতে বাংলাদেশের লোকনৃত্য নিয়েই কাজ করতেন। পরবর্তী সময় তিনি উপলব্ধি করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার জন্য দেশীয় নৃত্যধারার গুরুত্ব অপরিসীম। যদিও তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেগুলোর চর্চা করেন, তবুও তার মূল মনোযোগ থাকে বাংলাদেশের লোকজ নৃত্যের ওপর। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি দেশের সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার নিজস্ব ঐতিহ্যের ভেতরে।
এই ভাবনা থেকেই তিনি ‘সাধনা’ নামের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে এটি ছিল নাচ ও গানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে, দলিলবদ্ধ করতে হবে এবং গবেষণার মাধ্যমে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি বিভিন্ন প্রযোজনা, গবেষণা এবং ডকুমেন্টেশনমূলক কাজ শুরু করেন।
লুবনা মরিয়মের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার গবেষণা। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেছেন, নৃত্যধারাগুলোকে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেগুলোকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এমন কিছু প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দেশের সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। এই কাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সংস্কৃতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং বিস্তৃত। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতি কখনও স্থির নয়; এটি পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন প্রভাবের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে যেমন বৌদ্ধ, বৈষ্ণব, সুফি এবং পাশ্চাত্য প্রভাব রয়েছে, তেমনি এগুলোর সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে একটি বৈচিত্র্যময় পরিচয়। তিনি এই বৈচিত্র্যকে ইতিবাচকভাবে দেখেন এবং নতুন প্রজন্মকে এই বহুমাত্রিক ইতিহাস সম্পর্কে জানার ওপর গুরুত্ব দেন।
বর্তমান সময়ে বিশ্বায়নের প্রভাবে দেশীয় সংস্কৃতি কিছুটা চাপে পড়েছে, এমন একটি বাস্তবতা স্বীকার করেও তিনি হতাশ নন। তার মতে, পরিবর্তনকে থামানো সম্ভব নয়, তবে সচেতনভাবে কাজ করলে ঐতিহ্যকে ধরে রাখা সম্ভব। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পারলে তারাই এই চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তার শিল্পচর্চা শুধু নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্প মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিশু ও তরুণদের শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে তারা একটি সুস্থ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হতে পারে।
তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য প্রযোজনা পরিচালনা করেছেন এবং দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তার কাজ প্রশংসিত হয়েছে এবং তিনি বাংলাদেশের নৃত্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে শিল্পকলা পদক উল্লেখযোগ্য।
তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি পুরস্কার বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। তার কাছে কাজই সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি মনে করেন, একজন মানুষ হিসেবে সততা এবং দায়িত্ববোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর পর মানুষ তাকে কীভাবে স্মরণ করবে এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, একজন সৎ মানুষ হিসেবে মনে রাখা হলেই তিনি সন্তুষ্ট থাকবেন।
লুবনা মরিয়মের জীবন ও কাজ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তিনি দেখিয়েছেন, শিল্পচর্চা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়; এটি সমাজ, ইতিহাস এবং মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রক্রিয়া। তার নিরলস প্রচেষ্টা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ এবং বিকাশের পথে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য তার কাজ একটি অনুপ্রেরণা। তিনি বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মই এই দায়িত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখবে। তার এই বিশ্বাসই তাকে এখনও সক্রিয় রাখে এবং নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করে।
সবশেষে বলা যায়, লুবনা মরিয়মের জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা যেখানে শিল্প, সংগ্রাম, চিন্তা এবং দায়বদ্ধতা একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই যাত্রা শুধু একজন মানুষের নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন।
দক্ষিণ এশীয় নৃত্যচর্চা
ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য মূলত ধর্মীয় আচার, পুরাণ, দর্শন এবং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ভরতনাট্যম, কথক, মণিপুরী, কুচিপুড়ি বা ওডিসি প্রতিটি ধারার নিজস্ব শরীরী ভাষা, তাল, লয়, মুদ্রা এবং অভিব্যক্তির ধরন রয়েছে। এখানে নাচ কেবল দেহের নড়াচড়া নয়; বরং এটি এক ধরনের ভাষা, যার মাধ্যমে গল্প বলা হয়। চোখের দৃষ্টি, মুখভঙ্গি, হাতের ইঙ্গিত সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিব্যক্তির জগৎ তৈরি হয়। ‘রস’ বা অনুভূতির প্রকাশ এই নৃত্যের কেন্দ্রীয় বিষয়, যেখানে ভালোবাসা, বেদনা, ভক্তি কিংবা ক্রোধ সূক্ষ্মভাবে ফুটে ওঠে। এই ধারায় শৃঙ্খলা, দীর্ঘ সাধনা এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা একজন শিল্পীর শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে।
অন্যদিকে সমসাময়িক দক্ষিণ এশীয় নৃত্য এই ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই নতুন ভাষা তৈরি করে। এটি শাস্ত্রীয় নৃত্যের উপাদান, লোকজ ধারা এবং পাশ্চাত্য আধুনিক নৃত্যশৈলীর সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে। এখানে নির্দিষ্ট কাঠামোর বাঁধন তুলনামূলকভাবে কম; শিল্পী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং সময়ের প্রশ্নগুলোকে নাচের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় মুদ্রা বা ভঙ্গিকে ভেঙে নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়, ফলে একটি নতুন নান্দনিকতা তৈরি হয়। এই ধারায় শহুরে জীবন, পরিচয়ের সংকট, লিঙ্গ-রাজনীতি কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের মতো বিষয়ও উঠে আসে, যা নাচকে কেবল নান্দনিক অভিজ্ঞতার বাইরে নিয়ে গিয়ে এক ধরনের বক্তব্যের মাধ্যম করে তোলে।
এই দুই ধারার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হলো পারস্পরিক প্রভাব। অনেক সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী শাস্ত্রীয় নৃত্যে প্রশিক্ষিত, ফলে তাদের কাজের ভেতরে ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট থাকে। আবার শাস্ত্রীয় নৃত্যও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যাখ্যা ও মঞ্চ-প্রয়োগ গ্রহণ করে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখে। ফলে এটি কোনো স্থির কাঠামো নয়; বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ এই দুই ধারার বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা একে অপরের কাজ থেকে প্রভাব নিচ্ছেন, নতুন ধরনের যৌথ প্রযোজনা তৈরি হচ্ছে এবং দক্ষিণ এশীয় নৃত্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুনভাবে পরিচিতি পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শাস্ত্রীয় নৃত্য আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধারণ করে রাখে আর সমসাময়িক নৃত্য সেই শিকড় থেকেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্ভাবনার জন্ম দেয়। এই দুই ধারার সংযোগেই দক্ষিণ এশিয়ার নৃত্যচর্চা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক, গতিশীল এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলমান।