নির্মাণসামগ্রীর দামে ঊর্ধ্বগতি

আবাসন ব্যবসা টালমাটাল

নির্মাণসামগ্রীর অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধিতে আবারও চাপে পড়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে চুক্তিমূল্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিবাদ বাড়ছে।  দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নির্মাণসামগ্রীর দামের লাগাম টেনে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তারা বলেছেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুদিন আগে যুদ্ধ ও তেল সংকটের অজুহাত  দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তো এ সমস্যা নেই। তাহলে দাম বাড়বে কেন? এ থেকে স্পষ্ট যে, এখানে বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে। এ সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব পড়বে।

বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শুধু রড সিমেন্ট নয়, বেড়েছে ইট, পাথর ও বালুসহ নির্মাণকাজে ব্যবহার্য অনেক পণ্যের দাম।  এ খাত ঘুরে দাঁড়ানোর নানা চেষ্টা করলেও বারবার হোঁচট খাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। তাই মনিটরিং কমিটি করে বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাব। 

কারওয়ান বাজারে রড-সিমেন্টের দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সিমেন্ট প্রতি ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে ৫২০ থেকে ৫৪০ টাকায়। আগে মূল্য ছিল ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা। প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৮৫ হাজার থেকে ৯৫ হাজার টাকায়।। আগে রডের মূল্য ৮০ হাজার টাকার কম ছিল। ফ্রেশ রড ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিএসআরএম ৯৩ হাজার টাকা টন বিক্রি করতে দেখা গেছে।

লোকাল বালু বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। লাল বালু প্রকারভেদে ১৮ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বালুর ১ থেকে দেড় হাজার টাকা মূল্য বেড়েছে। ইট ট্রাক প্রতি ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে মূল্য ছিল ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। পাথর বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বর্গফুট। এর আগে ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হতো বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

রডের পর সিমেন্টে ও ইটের দাম বেড়ে যাওয়ায় আবারও চাপে পড়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। অনেকে চলমান প্রজেক্ট বর্ষার আগে শেষ করতে দ্রুত গতিতে কাজ করতে চাচ্ছিলেন। নির্মাণশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আবাসন, অবকাঠামো খাতের ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এর ফলে শুধু ব্যবসা নয়, সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়নও ব্যাহত হতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতি মুনাফালোভী একটি চক্র এ কাজ করছে। তাই এখনই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আবাসন ব্যবসায় আবার দুর্দিন নেমে আসতে পারে। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. হারুন অর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্মাণসামগ্রির দাম অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে গেছে। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় আবাসন ব্যবসায়ীরা মারাত্মক বেকায়দায় পড়েছেন। বিশেষ করে গ্রাহকের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করতে পারছেন না। বাড়তি দামে ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে হচ্ছে, কিন্তু চুক্তিমূল্যের বাইরে দাম পাচ্ছেন না। নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রেও হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর প্রভাব গ্রাহকের মধ্যেও পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আবাসন ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে।

ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত সেল গঠন করলে কেউ সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াতে পারবে না। দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ থাকলে সরকারের কাছে আবেদন করতে হবে। বিশে^র অধিকাংশ দেশেই এ পদ্ধতি চালু রয়েছে। আসন্ন বাজেটে নির্মাণসামগ্রির দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ না নিলে, এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে; যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।’

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছে বলে দাবি করছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। পাল্টা হামলার ঘটনায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর থেকে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় সমুদ্রপথে জাহাজভাড়া বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে শিপিং কোম্পানিগুলোও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করেছে। ফলে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বেড়ে গেছে।

সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালের প্রায় সবই আমদানিনির্ভর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশের ৩৯টি সিমেন্ট কোম্পানি মোট ৪ কোটি ৩৬ লাখ টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ ও সø্যাগ।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিমেন্টের কাঁচামালের প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ওই অঞ্চল থেকে দুই সপ্তাহ ধরে নতুন করে কাঁচামাল আসেনি। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ কিছুটা সংকুচিত হয়েছে এবং সিমেন্টশিল্পে এর প্রভাব পড়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে জ্বালানি খাত। কিন্তু জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে দেশে সাধারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। অথচ কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও রডের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া ভালো ইঙ্গিত বহন করে না। তাছাড়া বাজারে যে রড আছে, তাতে তো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়ার কথা নয়।

কারওয়ান বাজারের রড়-সিমেন্টের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করেই দাম বেড়ে গেছে। এতে খুচরা ক্রেতা কমে গেছে। বড় ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আাশা ছিল, নতুন সরকার এলে সব সেক্টরেই নির্মাণকাজ বাড়বে। আমাদের ব্যবসা ভালো হবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি। দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় খুব খারাপ অবস্থা যাচ্ছে।