সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম : জয়ের জন্য প্রয়োজন মাত্র ৩ উইকেট, আর পাকিস্তানের দরকার ১২১ রান এমন সমীকরণ নিয়ে পঞ্চম দিনে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। তবে সকালের শুরুটা যেমন সহজ ভাবা হয়েছিল, মাঠের চিত্রটা ছিল তার উল্টো। মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খানের প্রতিরোধে প্রথম ঘণ্টা বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছিল চরম অস্বস্তি। দ্রুত রান আসছিল পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডে, বাড়ছিল শঙ্কাও। এর মধ্যে প্রথম ওভারেই নাহিদ রানার বলে মোহাম্মদ রিজওয়ানের ক্যাচ গালিতে তালুবন্দি করতে পারলেন না মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর লিটন দাস ও তাইজুল ইসলামের ভুল বোঝাবুঝিতে আরও একটি সুযোগ হাতছাড়া।
টেনশন যেন তখন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছিল সিলেটের সবুজ ঘাসে। রিজওয়ান ও সাজিদ খান দ্রুত রান তুলে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিলেন, ব্যবধান নেমে এসেছিল আশির নিচে। কিন্তু ‘একটা ভালো বলের’ অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশ দমে যায়নি। ড্রিংকস ব্রেকের ঠিক পরেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিরতির পর দ্বিতীয় বলেই আঘাত হানেন তাইজুল ইসলাম। ২৮ রান করা সাজিদ খানকে সিøপে নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ বানিয়ে ভাঙেন ৫৪ রানের প্রতিরোধের।
ব্যাস! ওই যে একটা উইকেট আরেকটি উইকেট ডেকে আনে! পরের ওভারেই শরিফুল ইসলামের বলে গালিতে সেই মিরাজের হাতেই ক্যাচ দিয়ে ৯৪ রানে বিদায় নেন সেঞ্চুরির সুবাস পেতে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ান। পাকিস্তানের শেষ আশাটুকুও সেখানেই শেষ। এর ঠিক ১২ বল পর, খুররম শাহজাদকে অভিষিক্ত তানজিদ হাসানের ক্যাচ বানিয়ে পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন তাইজুল। মাত্র ১৩ বলের ব্যবধানে কোনো রান না তুলে শেষ ৩ উইকেট হারিয়ে ৩৫৮ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। ৭৮ রানের এক মহাকাব্যিক জয়ে মেতে ওঠে বাংলাদেশ।
এই জয়ের মাহাত্ম্য শুধু একটি ম্যাচ জয়ে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আড়াই যুগের ইতিহাসে সবচেয়ে সোনালি এক অধ্যায়। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলকে টানা চারটি টেস্ট ম্যাচে হারানোর স্বাদ পেল বাংলাদেশ (গত বছর আয়ারল্যান্ডকে ২-০ ও এবার পাকিস্তানকে ২-০)। অথচ এই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ১৩টি টেস্টে বাংলাদেশের কোনো জয়ই ছিল না!
২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার দেশের মাটিতেও সেই একই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি। তবে এবারের কৃতিত্ব যেন একটু বেশিই স্পেশাল। সেবার দুটি টেস্টেই বাংলাদেশ টস জিতেছিল, আর এবার মিরপুর ও সিলেট দুই টেস্টেই টস হেরে সম্পূর্ণ সবুজ ও পেস সহায়ক উইকেটে আগে ব্যাট করতে হয়েছে শান্ত-লিটনদের। সব প্রতিকূলতা ও কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ জিতেই এসেছে এ ট্রফি।
পুরো সিরিজজুড়ে মিরপুর আর সিলেট টেস্ট মেলালে এমন খুব কম সময় এসেছে, যখন মনে হয়েছে পাকিস্তান চালকের আসনে আছে। যেখানেই পাকিস্তান মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে, সেখানেই বাংলাদেশ অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ফিরেছে। প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান করা বাংলাদেশ যখন ব্যাকফুটে, তখন বোলাররা পাকিস্তানকে ২৩২ রানে আটকে লিড এনে দেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯০ রানের বিশাল সংগ্রহই মূলত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়, যেখানে প্রথম দিনে বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ১২৬ রানের এক অনবদ্য ও উদ্ধারকর্তা ইনিংস খেলেন লিটন কুমার দাস।
চতুর্থ ইনিংসে ১২০ রান খরচায় ৬ উইকেট নিয়ে শেষ দিনের নায়ক নিঃসন্দেহে বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম, ম্যাচে তার শিকার ৯ উইকেট। তবে প্রথম ইনিংসে ধ্বংসস্তূপ থেকে দলকে টেনে তোলা এবং দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করার সুবাদে ম্যাচসেরার (ম্যান অব দ্য ম্যাচ) পুরস্কার জেতেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটার লিটন কুমার দাস। আর পুরো সিরিজজুড়ে ব্যাট হাতে ধারাবাহিক ও দায়িত্বশীল পারফরম্যান্সের জন্য সিরিজসেরার (ম্যান অব দ্য সিরিজ) গৌরব অর্জন করেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম।
ম্যাচশেষে বাংলাদেশ দলের উদযাপন ছিল চোখে পড়ার মতো, তবে তাতে কোনো বাঁধনহারা উন্মাদনা ছিল না। শান্ত-তাসকিনদের শরীরী ভাষায় যেন ফুটে উঠছিল এক পরিণত পরাশক্তির আত্মবিশ্বাস, যেন তারা মুখ ফুটে বলতে চাইলেন ‘বিশ্বসেরাদের হারানো এখন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’ পাকিস্তানের কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম বলে দিয়েছেন বাংলাদেশ এখন টেস্টেও বিশ্বসেরাদের সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের এই ডাবল হোয়াইটওয়াশে টেস্ট র্যাংকিংয়ে প্রভাব পড়েছে। প্রথমবার ৭ নম্বরে উঠে এসেছে। আর শ্রীলংকার সঙ্গে একটি ড্র আর পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই জয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ টেবিলে ৫ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ভারতের মতো দলকে টপকে।
এই আত্মবিশ্বাসী জয় নিয়ে বাংলাদেশ আগামী আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের সঙ্গে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাবে।