‘আমার বুকের ধনকে বাঁচান, একটা আইসিইউ দেন’

সময় তখন দুপুর ১২টা। ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের সামনে এক নারী বারে বারে মূর্ছা যাচ্ছেন। একটু হুঁশ ফিরলেই বলে উঠছেন ‘আমার বুকের ধনকে বাঁচান। আমার তোতা পাখির জন্য একটা আইসিইউ দেন।’ আত্মীয়স্বজনের কেউ তাকে থামাতে পারছে না। হামে আক্রান্ত সংকটাপন্ন শিশুকে বাঁচাতে একটি আইসিইউর জন্য বাবা-মা ও স্বজনদের এমন আর্তনাদ-হাহাকার এখন রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই চোখে পড়ে।

দেশে একদিকে হামের চোখ রাঙানি থামছে না। অন্যদিকে, হাসপাতালগুলোতে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) সংকট হাম আক্রান্ত শিশুদের জীবন আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে। আইসিইউ সাপোর্ট ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট শিশুদের জীবনঝুঁকি সৃষ্টি করছে। আইসিইউ সাপোর্ট বাড়ানো না গেলে শিশুমৃত্যুতে লাগাম টানা যাবে না। 

গতকাল বুধবার রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে সরেজমিনে হাম আক্রান্ত শিশুদের বাবা-মায়ের মুখে আইসিইউ সংকটের কথা শোনা যায়। জানা যায়, মরণাপন্ন সন্তানদের নিয়ে কি দুর্বিষহ অবস্থায় কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। আইসিইউর অপ্রতুলতা হাম আক্রান্ত অবুঝ শিশুদের পরিবারগুলোকে রেখেছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। একটা আইসিইউ পাওয়া অসহায় পরিবারের কাছে সোনার হরিণ পাওয়ার মতো হয়ে উঠেছে। সন্তানকে বাঁচাতে আইসিইউ জরুরি কিন্তু তা না পাওয়ার কারণে চোখের সামনে অবুঝ সন্তান মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে। বাবা-মা বেহুঁশ হয়ে পড়ছেন, আসমান কেঁপে ওঠা আহাজারি করছেন। তাদের আর্তনাদে হাসপাতালের সামনের পরিবেশ ভারী হয়ে থাকে।

শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সামনে বারে বারে মূর্ছা যাওয়া ও সন্তানকে বাঁচাতে আইসিইউর জন্য হাহাকার করা ওই নারীর নাম তাসলিমা জাহান। তার হামে আক্রান্ত ৮-৯ মাস বয়সী মেয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাসলিমার এক আত্মীয় জানান, অন্য হাসপাতাল থেকে শিশুটিকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে হস্তান্তরের কথা বলে দেওয়া হয়। তাই মেয়েকে নিয়ে বাবা-মা ও স্বজনরা শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসে। এই প্রতিবেদক তাসলিমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাসলিমা বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আর একটু হুঁশ ফিরলেই আর্তনাদ করে বলে উঠছেন, তার মেয়েকে একটি আইসিউ দিতে, তাকে বাঁচাতে।     

ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সারা দেশ থেকে হাম আক্রান্ত শিশুরা যেভাবে ঢাকামুখী হচ্ছে তাতে হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও বেগতিক হয়ে উঠছে। হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে আক্রান্ত শিশু ও তাদের বাবা-মা নতুন নতুন ভোগান্তিতে পড়ছেন। ঘোরাঘুরিতে চিকিৎসাব্যয়ও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। পরিবারের অন্য প্রয়োজন মেটাতে আর্থিক সংকট ঘোরতর হয়ে উঠছে। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের (ডিএনসিসি) জরুরি বিভাগের একজন নারী চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাম ভাইরাস আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউ সাপোর্ট সবচেয়ে বেশি জরুরি। হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলায় কম আইসিইউ সাপোর্ট থাকায় শিশুদের জীবন সংকাটাপন্ন হয়ে উঠছে। আইসিইউর সাপোর্ট দরকার তেমন শিশুকেও সাধারণ বেডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক শিশুকে হাসপাতালে রাখতে পারছি না।’

শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য দুটি ওয়ার্ড ঠিক করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ১৪ জনকে। ফলে সারা দেশ থেকে আসা হাম আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউ জরুরি হলেও সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালটির। এ প্রসঙ্গে শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আইসিইউর দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রার ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে আসা বেশির ভাগ হাম আক্রান্ত শিশুর আইসিইউ সাপোর্ট ভীষণ জরুরি। এই রোগীদের জন্য আমাদের ১৪টি আইসিইউ রয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্য হাসপাতালগুলোর অবস্থাও একই। দ্রুত আইসিইউ বাড়ানো না গেলে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি দূর করার কোনো সুযোগ নেই।

নারায়ণগঞ্জের ভুলতা গাওসিয়া থেকে বাবা রায়হান খান ও মা মিলি আক্তারের কোলে চড়ে গত ১৮ মে সাত মাসের মোহতামিনা খান শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তার আইসিইউ ভীষণ জরুরি। আইসিইউর জন্য বাবা-মা একাধিক হাসপাতাল ঘুরেছেন। কিন্তু না পাওয়ায় নিরুপায় হয়ে মেয়েকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রাখা হয়েছে। আইসিইউর সাপোর্ট দরকার শিশুকে থাকতে হচ্ছে সাধারণ বেডেই। তাতে শিশুটির অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। মোহতামিমার সারা শরীর লালছে র‌্যাশে ভরে আছে, বেডে রেখে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হলেও শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে মেয়েটির। হাসপাতালের নির্দিষ্ট হাম ওয়ার্ডের ১৬ নাম্বার বেডে শিশুটিকে নিয়ে বিলাপ করছেন মা মিলি আক্তার। কোনোভাবেই তার বিলাপ থামছে না। একবার সন্তানের দিকে তাকান আবার বিলাপ শুরু করেন। ফিজিওথেরাপিস্ট বাবা রায়হান খানের চোখেমুখে ক্লান্তির ও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অন্ধকার দেখছেন। আর্থিকভাবে তেমন বেশি সচ্ছল নয় পরিবারটি। তবু সন্তানকে বাঁচাতে একটি আইসিইউর জন্য যত টাকাই খরচ হোক দিতে চান রায়হান। 

রায়হান খান বলেন, ‘ঢাকার কোনো হাসপাতাল বাকি নেই যেখানে যাইনি, চেষ্টা করিনি, যোগাযোগ করিনি। আইসিইউ মেলাতে পারছি না। আইসিইউ পাব আশায় তিন দিন হলো শিশু হাসপাতালে ভর্তি। কোনো হাসপাতালে একটি আইসিইউ ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমার অবুঝ শিশু বেডে শুয়ে ছটফট করছে, চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া নিরুপায় আমরা।’