খিলক্ষেতে চাঁদাবাজির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক মামুন আটক

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার বহুল আলোচিত চিহ্নিত চাঁদাবাজ মো. মামুন (৪৪) কে গ্রেপ্তার করেছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। 

বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে খিলক্ষেত বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খিলক্ষেত থানার এফআইআর নং-২৭, তারিখ ২৫ এপ্রিল ২০২৬ এবং জি আর নং-৯২ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৪২৭/৫০৬ ধারায় দায়ের করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত মামুনের পিতা মৃত ইদ্রিস আলী এবং মাতা মোসা. ফিরুজা বেগম। তার স্থায়ী ঠিকানা নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানার মাহমুদপুর গ্রামের মরহুম ইদ্রিস আলী মেম্বার বাড়ি। বর্তমানে তিনি খিলক্ষেত থানাধীন মধ্যপাড়া এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, পথচারী, হকার ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে খিলক্ষেত ফুটওভার ব্রিজ, বাসস্ট্যান্ড, রেলক্রসিং ও খিলক্ষেত বাজারকেন্দ্রিক একটি চাঁদাবাজ চক্রের নেতৃত্ব দিতেন মামুন। বিশেষ করে ফলের দোকান, ভাসমান হকার, ফুটপাতভিত্তিক ব্যবসায়ী এবং অস্থায়ী দোকানিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খিলক্ষেত বাজারের এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, এখানে ব্যবসা করতে হলে মামুনের লোকজনকে টাকা দিতেই হতো। জায়গা বুঝে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। টাকা না দিলে দোকান বসাতে নানা সমস্যা তৈরি করা হতো।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন খাত থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ হাজার টাকার মতো চাঁদা আদায় করা হতো। শুধু ব্যবসায়ী নয়, ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় অবস্থান করা ভিক্ষুকদের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে সেখানে অবস্থান করতে দেওয়া হতো না।

খিলক্ষেতের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মামুন নিজেকে খিলক্ষেত থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের “প্রভাবশালী নেতা” হিসেবে পরিচয় দিতেন। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার কর্মকাণ্ড আরও প্রকাশ্য ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও একটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, কথিত এই চাঁদাবাজ মামুন খিলক্ষেত থানা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতার সরাসরি আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এলাকার একাধিক সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় চাঁদাবাজির অভিযোগে সেনাবাহিনী তাকে আটক করে পূর্বাচল আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনার পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে আবারও এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদাবাজির টাকায় মামুন ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কয়েক বছর আগে সাধারণ জীবনযাপন করলেও এখন তার আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়েই তিনি একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন।

খিলক্ষেত বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, অনেকেই ভয় পেয়ে মুখ খুলতে চাইত না। কারণ প্রতিবাদ করলে দোকানে হামলা, ভয়ভীতি কিংবা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা থাকত।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ফুটপাত ও সড়ক দখলকে কেন্দ্র করে খিলক্ষেতে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে এই চক্রের বড় ভূমিকা ছিল। সাধারণ মানুষ ঠিকমতো হাঁটতেও পারত না।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের আগস্টে স্থানীয় প্রশাসন ও থানা পুলিশের উদ্যোগে খিলক্ষেত ফুটওভার ব্রিজ, বাসস্ট্যান্ড ও রেলক্রসিং এলাকা হকার ও ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় এলাকাবাসী উদ্যোগটিকে স্বাগত জানালেও পরে সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামুনের নেতৃত্বাধীন চাঁদাবাজ চক্রের কারণেই সরকারি সেই উদ্যোগ কার্যকরভাবে টেকেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, কোনো সাইনবোর্ডেই কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না। সমগ্র খিলক্ষেত এলাকাকে নিরাপদ ও মাদকমুক্ত করার লক্ষে দিন-রাত কাজ করছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। সবার সহযোগিতা থাকলে জন-প্রত্যাশার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে পারব।

তিনি আরও বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। খিলক্ষেত এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মামুনের গ্রেপ্তারের খবরে খিলক্ষেত বাজার ও আশপাশের এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। অনেকেই এটিকে দীর্ঘদিনের ভয় ও আতঙ্কের অবসানের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে এলাকাবাসীর দাবি, শুধু একজনকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না; তার সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

খিলক্ষেতের সাধারণ ব্যবসায়ী, পথচারী ও বাসিন্দাদের প্রত্যাশা—এই গ্রেপ্তার যেন শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান হয়ে না থাকে; বরং দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ভয়ভীতি ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপে পরিণত হয়।