বিশ্বকাপের আঙিনায় জার্মানি মানেই পাওয়ার ফুটবল, নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক ইস্পাতকঠিন মানসিকতার প্রদর্শনী। বিশ্ব ফুটবলে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই পরাশক্তি ব্রাজিল ও ইতালির মতোই এক অনন্য সমার্থক নাম। ২০১৪ সালের ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের সেই শ্বাসরুদ্ধকর গোলে সর্বশেষ যখন জার্মানি সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিল, তখন মনে হয়েছিল বিশ্ব ফুটবলে তাদের একাধিপত্য হয়তো আরও বহু বছর চলবে। কিন্তু এরপরই ফুটবলের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় জার্মানদের।
২০১৪ সালের সেই মহাকাব্যিক বিশ্বজয়ের পর বিশ্বমঞ্চে জার্মানির গল্পটা কেবলই আক্ষেপ, লজ্জা আর চরম হতাশার। গত দুটি বিশ্বকাপে (২০১৮ ও ২০২২) চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকেই। যে দলটির নামের পাশে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল খেলার অবিশ্বাস্য রেকর্ড শোভা পায়, তাদের এমন করুণ দশা বিশ্ব ফুটবলকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। হান্সি ফ্লিকের ২৫ ম্যাচের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালে দলের হাল ধরেন তরুণ মাস্টারমাইন্ড জুলিয়ান নাগেলসম্যান। ঘরের মাঠে ২০২৪ ইউরোতে দলকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গেলেও, এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে বিশ্বজয়ের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই মিশন শুরু করবে জার্মানি।
জুলিয়ান নাগেলসম্যানের আধুনিক দর্শন : ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে দায়িত্ব নেওয়ার পর জার্মান ফুটবলকে নতুন এক আধুনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন জুলিয়ান নাগেলসম্যান। জার্মানির ঐতিহ্যবাহী পাওয়ার ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং ঘরানার সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন আধুনিক গতির তীব্রতা। তার দর্শনে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি আক্রমণভাগে নিখুঁত ও সরাসরি ফুটবল খেলার ওপর জোর দেওয়া হয়। তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে একটি সুশৃঙ্খল দল গঠন করাই নাগেলসম্যানের মূল কৌশল, যার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে ২০২৬-এর এই মহামঞ্চ।
মূল ভরসা ভির্টজ, ভল্টমেড ও কিমিচ : সার্জ নাব্রির অনুপস্থিতিতে জার্মানির আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি ও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভা লিভারপুলের ফ্লোরিয়ান ভির্টজ। মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চূর্ণ করার মূল দায়িত্ব থাকবে এই তরুণ তুর্কির কাঁধেই।
আক্রমণভাগে গোল করার মূল দায়িত্ব থাকবে নিউক্যাসলের স্ট্রাইকার নিক ভল্টমেডের ওপর, যিনি বাছাইপর্বে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৪টি গোল করে দলের নতুন ট্রাম্পকার্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আর পুরো দলের অন-ফিল্ড লিডারশিপ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণ ও আক্রমণের সেতুবন্ধ হিসেবে আসল ভরসা জোগাবেন অভিজ্ঞ জোশুয়া কিমিচ।
অবসর ভেঙে ফিরলেন নয়্যার
বিশ্বকাপ সামনে রেখে ফুটবলপ্রেমীদের বড় চমক দিলেন জার্মানির কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যান। ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারকে অবসর ভেঙে আবারও জাতীয় দলে ফিরিয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানো নয়্যারকে বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নয়্যারের এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন হফেনহাইমের ৩৫ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ওলিভার বাউম্যানের জন্য একটি বড় ধাক্কা। নয়্যারের ফেরার গুঞ্জন ওঠার আগ পর্যন্ত কোচ নাগেলসম্যান বাউম্যানকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, তিনিই হতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপের ‘নাম্বার ওয়ান’ বা মূল গোলরক্ষক। বুন্দেসলিগায় ৫০০-র বেশি ম্যাচ খেলা বাউম্যান জাতীয় দলের হয়ে ১১টি ম্যাচ খেলেছেন। তবে বাউম্যানকেও দলে রেখেছেন নাগেসম্যান। তবে নয়্যারের উত্তরসূরি ভাবা বার্সেলোনার গোলরক্ষক মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন ইনজুরির কারণে দলে জায়গা পাননি।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন নয়্যার; বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিরুদ্ধে তার পারফরম্যান্স সবাইকে মুগ্ধ করে, যার ফলে তাকে দলে নেওয়ার দাবি জোরালো হয়। জার্মানির হয়ে ১২৪ ম্যাচ খেলা নয়্যার সর্বশেষ ম্যাচটি খেলেছিলেন ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে। তবে নয়্যারকে নিয়ে একমাত্র দুশ্চিন্তা তার ইনজুরি। বুন্দেসলিগার শেষ ম্যাচে বাঁ পায়ের পেশির সমস্যার কারণে মাঠ ছাড়েন তিনি। আগামী শনিবার স্টুটগার্টের বিপক্ষে জার্মান কাপের ফাইনালে তিনি খেলতে পারবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : ওলিভার বাউম্যান (হফেনহাইম), ম্যানুয়েল নয়্যার (বায়ার্ন মিউনিখ), আলেকজান্ডার নুবেল (স্টুটগার্ট)। রক্ষণভাগ : জশুয়া কিমিচ (বায়ার্ন মিউনিখ), নিকো শ্লটারবেক (বরুশিয়া ডর্টমুন্ড), নাথানিয়েল ব্রাউন (আইন্ট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট), ডেভিড রাউম (লাইপজিগ), ভালদেমার আন্তন (বরুশিয়া ডর্টমুন্ড), পাসকাল গ্রস (ব্রাইটন), আন্তোনিও রুডিগার (রিয়াল মাদ্রিদ), মালিক থিয়াও (নিউক্যাসল), জোনাথান তাহ (বায়ার্ন মিউনিখ)। মিডফিল্ডার : জামাল মুসিয়ালা (বায়ার্ন মিউনিখ), জেমি লেভেলিং (স্টুটগার্ট), আলেকজান্ডার পাভলোভিচ (বায়ার্ন মিউনিখ), নাদিম আমিরি (মেইনজ), ফেলিক্স নমেচা (বরুশিয়া ডর্টমুন্ড), অ্যাঞ্জেলো স্টিলার (স্টুটগার্ট), লিওন গোরেটজকা (বায়ার্ন মিউনিখ)। আক্রমণভাগ : কাই হাভার্টজ (আর্সেনাল), ডেনিজ উন্দাভ (স্টুটগার্ট), মাক্সিমিলিয়ান বায়ার (বরুশিয়া ডর্টমুন্ড), ফ্লোরিয়ান ভিরটজ (লিভারপুল), নিক ভোল্টমেড (নিউক্যাসল), লেনার্ট কার্ল (বায়ার্ন মিউনিখ), লেরয় সানে (গালাতাসারে)।