বৈশি^ক উৎপাদনকারীর তালিকায় নেদারল্যান্ডসের নাম নেই, কারণ এদেশে কোনো আম উৎপাদন হয় না। অথচ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে শীর্ষ পাঁচে। অথচ বাংলাদেশ শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশের তালিকার শীর্ষ দশে থাকলেও রপ্তানিকারক দেশগুলোর মূল তালিকায় নাম নেই। কারণ রপ্তানি হয় নামমাত্র। অথচ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে লক্ষাধিক টন আম রপ্তানির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল চলতি মৌসুমে আম রপ্তানির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। খামারবাড়ির কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে (বিএআরসি) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। অনুষ্ঠানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ-সহ আম উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে ২৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। তবে সে সময়ে রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। যা দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি। সংখ্যার হিসাব করলে বাংলাদেশ এখন কাগজে-কলমে বিশ্বের ২৬টি দেশে আম রপ্তানি করে। পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড নিরাপদ পদ্ধতিতে আম উৎপাদন ও রপ্তানি করে। শুধুমাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত মানসম্মত ও নিরাপদ আম রপ্তানি করে শীর্ষে উঠে এসেছে নেদারল্যান্ডস। শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেই ৩৬ শতাংশ আম রপ্তানি করে দেশটি। ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যাান্ডের মতো দেশগুলোও রয়েছে শীর্ষ উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশের তালিকায়। অথচ শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার পরও ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে একেবারে বিমানবন্দর পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থাপনা পরিপালন না করা হলে রপ্তানির এই সুযোগ কাজে লাগানো যাবে না।
প্রবন্ধ উপস্থাপক আরিফুর রহমান বলেন, উত্তম
কৃষি চর্চা অনুসরণ করে নিরাপদ আম উৎপাদন না করা, উৎপাদনে আমদানিকারক দেশের শর্ত পরিপালন না করা, সংগ্রহোত্তর গুণগত মান বজায় রেখে গ্রেডিং, প্যাকিং করে কুলিং ভ্যানে আম পরিবহন না করা, আমে উপস্থিত পেস্টিসাইডের রেসিডিউ অ্যানালাইসিস ও ফলের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব না থাকা; প্রয়োজনীয় উপকরণ ফ্রুট ব্যাগ ও অন্যান্য উপকরণ প্রতিযোগিতামূলক দামে না পাওয়া, কম সেলফ লাইফ, সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে যথাযথ প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার না করা, নতুন বাজার সৃষ্টি করতে না পারা, ব্রান্ডং ইমেজ তৈরি না করা রপ্তানি বাজার ধরতে না পারার বড় কারণ।
একইসঙ্গে উৎপাদন এলাকায় আধুনিক প্যাকিং হাউজের অভাব, আমের উন্নত সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোয়ারেন্টাইন পেস্ট নিয়ন্ত্রণে সেন্সর বেইজড হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ভিএইচটিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো ও উন্নত প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। এছাড়া দেশে উৎপাদিত আমের ট্রেসিবিলিটি না থাকাও রপ্তানি বাজার ধরতে না পারার একটি বড় কারণ বলে তুলে ধরেন তিনি।
রপ্তানিকারকরা জানান, তারা উত্তম কৃষি চর্চা মেনে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করে রপ্তানির জন্য আম উৎপাদনে কাজ করছেন। কিন্তু বিমানবন্দরে রপ্তানি সহযোগী কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা না থাকা, স্টোরেজ সুবিধা না থাকা, উচ্চ বিমান ভাড়া এবং পরিবহনে কুল চেইনের অভাবে রপ্তানি বাজারে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশের আম স্বাদে ও গন্ধে যে কোনো ক্রেতাকে সহজেই আকৃষ্ট করে। যদিও এই ব্যবস্থাপনাগুলো করেই থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডস রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানির সব বাধা দূর করা হবে। বাংলাদেশ কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অন্যতম উপযোগী দেশ হলেও নীতিগত ও আইনগত কিছু জটিলতার কারণে এ খাত এখনো রপ্তানিতে প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
তিনি বলেন, রপ্তানি বাড়ানোর জন্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর পর্যন্ত যা যা করা দরকার কৃষি মন্ত্রণালয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও জানান।
অনুষ্ঠানে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশ থেকে বড় আকারে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এজন্য চীন আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে একটি আধুনিক প্যাকিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা গড়ে তুলবে বলে জানিয়েছে।