গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের এ ঘটনার দুই মাস ১২ দিন পর শুরু হয় বিচার এবং মাত্র ২১ দিনে (১৩ কার্যদিবস) শুনানি নিয়ে আলোচিত এ মামলায় রায় দেয় আদালত। ওই বছরের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি আছিয়ার বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে প্রাণদন্ডাদেশ দেয়। মৃত্যুদন্ডাদেশ নিশ্চিতে রায়ের চার দিনের মাথায় হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের নথি) পাঠানো হয় হাইকোর্টে। তবে, এক বছর পার হলেও এ মামলার শুনানি এখনো শুরু হয়নি।
দেশের ফৌজদারি মামলার ইতিহাসে আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি ছিল দ্বিতীয় দ্রুততম রায়। ২০২০ সালে ৩ অক্টোবর বাগেরহাটের মংলায় ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ মামলায় ৫৩ বছর বয়সী আব্দুল মান্নান সরকারকে আসামি করা হয়। অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশের পর মাত্র সাত কার্যদিবস শুনানি শেষে একই মাসের ১৯ অক্টোবর মান্নানকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেয় বাগেরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
ধর্ষণের মতো ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এ দুটি ঘটনা ব্যতিক্রম। বাস্তবতা হলো, শিশুহত্যা, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। ঘটনার পর মামলা, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু, সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন, যুক্তিতর্কের শুনানি অধস্তন আদালতে এ কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে মামলার রায় হয়। এর মধ্যে কোনো কোনো মামলায় সাক্ষীর গড়হাজিরা কিংবা সময়ের আবেদনে শুনানি হয় ধীরগতিতে। যা চলে বছরের পর বছর। রায়ে কোনো আসামির সাজা হলে অবধারিতভাবে হাইকোর্টে আপিল কিংবা জেল আপিল হয়। হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল বিভাগে আপিল হয়। আইন ও আদালতের এই প্রতিটি স্তরে পার হয় বছরের পর বছর। আর লাখ লাখ মামলার জট তো আছেই। মামলা পড়ে এক ধরনের বেড়াজালে। সংগত কারণে হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বেশিরভাগ মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না বলে বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদ-ের রায় হলে তা কার্যকরে উচ্চ আদালতের অনুমোদন ও শুনানি হতে হয়। এ জন্য অধস্তন আদালতের রায়ের অনুলিপি ও মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হলে এটি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদন) হিসেবে নথিভুক্ত এবং শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামি হাইকোর্টে আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান। গত এক দশকের পরিসংখ্যান বলছে, ফাঁসির মামলা হাইকোর্টের কার্যতালিকায় আসতে কমপক্ষে পাঁচ বছর লাগে। তবে, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় অগ্রাধিকারভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি ও শুনানি হয়। আছিয়া হত্যা মামলাসহ একাধিক শিশুহত্যা মামলার বিষয়ে সবশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ২০২৫ সালে ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সময়ে ৩ হাজার ১১ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৪৩ নারী ও শিশু। এদের ৫৫০ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্র্থাৎ তারা শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ ভুক্তভোগীকে।
গত ২ মে সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা’ নিয়ে গবেষণার তথ্য প্রকাশ করা হয়। ৩২টি জেলার ৪২টি ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে একই বছরের জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার রায় নিয়ে পর্যালোচনা করে গবেষক দল। তাতে বেরিয়ে আসে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারে মাত্র ৩ শতাংশ মামলায় সাজা হয়, এছাড়া ৭০ শতাংশ মামলায় আসামি খালাস পায়। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে বলে গবেষণায় উঠে আসে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, নারী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধস্তন আদালতে ৪০ লাখের বেশি মামলার জন্য মাত্র ২ হাজার বিচারক আছেন। এটি খুবই কম। মামলার যে হার তাতে ১০ হাজার বিচারক প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রয়োজন প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুবিধা। কিন্তু সেটি কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সন্দিহান এ আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৬ মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে আইনে। কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক নয়। অনেক সময় কিছু মামলা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ মামলাই থাকে বছরের পর বছর বিচারাধীন। এখন হাইকোর্টেও বিচার নিষ্পত্তির জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া যায় কি না, সেটিও ভেবে দেখতে হবে।’
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে ৫২৫ শিশু বিভিন্নভাবে হত্যার শিকার হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে জানা যায়। তবে, শিশুহত্যার মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলাতেও ধীরগতি বা শ্লথগতি রয়েছে। ২০১৫ সালে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ তুলে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে নিন্দা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৬ আগস্ট ১৩ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। মাত্র ১৭ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষে একই বছরের ৮ নভেম্বর সিলেটের বিচারিক আদালত চার আসামিকে মৃত্যুদন্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডাদেশ দেয়। মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি পাঠানো হয় হাইকোর্টে। সেখানেও দ্রুত শুনানি শেষে দুই বছরের কম সময়ে ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল হাইকোর্টের রায় হয়। তাতে চার আসামির মৃত্যুদন্ড বহাল থাকে। বিচারিক আদালতে দেওয়া একজনের যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ছয় মাসের কারাদন্ডের রায় দেয় হাইকোর্ট। তবে, অদ্যাবধি মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার এত বেশি চাপ, আর এই চাপের পেছনে কারণ হলো অপরাধ বেশি হচ্ছে। কেন বেশি অপরাধ হচ্ছে এর কারণটা হলো মানুষ মনে করে যে, অপরাধ করলে তো কোনো সমস্যা হবে না। ফলে বিচার দ্রুত করে দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘আছিয়ার ঘটনায় হয়তো বিচার দ্রুত হয়েছিল। কিন্তু এমন ঘটনা তো আরও শত শত আছে যা এখনো বিচারের পর্যায়ে আছে।’ অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে এত বেশি মামলা ও এত বেশি অপরাধ হচ্ছে, যার দ্রুত বিচার করার সক্ষমতা বিচার বিভাগের নেই। সমাধান হলো একটা মহাপরিকল্পনা করতে হবে। প্রথমত আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা দরকার। সে ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।’