নাজিয়া আফরিন
স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ, নারী মৈত্রী
কোরবানির ঈদে অনেক মানুষ মাংস খাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেন আবার অনেকের ধারণা যেহেতু এ মাংস ধর্মীয় উৎসবের মাংস, তাই যত খুশি ততই খাওয়া যাবে তাতে কোনো শারীরিক ক্ষতি হবে না। প্রকৃতপক্ষে ভুল ধারণা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক ৮৫ গ্রাম গরুর মাংস খেতে পারবেন। ৮৫ গ্রাম চর্বি ছাড়া গরুর মাংস খেলে দৈনিক ক্যালরির চাহিদার ১০ শতাংশ পূরণ করবে। রান্না করা তিন টুকরো মাংসেই কিন্তু ৮৫ গ্রাম হয়ে যায়, তাই দৈনিক তিন টুকরোর বেশি মাংস না খাওয়া উচিত। গরুর মাংস শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে এবং ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। শরীরের বৃদ্ধি ও বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে এবং দ্রুত ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। এ ছাড়া, দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। অতিরিক্ত আলসেমি বা ক্লান্তি দূর করে। ডায়রিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।
গরুর মাংসের কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। এ ধরনের রেড মিটে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল থাকে তাই অনেক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। তবে কিছু নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে আশঙ্কা প্রায় থাকেই না।
ডায়াবেটিস : ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১.২৫- ১.৫ গ্রাম প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রোটিন দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে তেল-চর্বিহীন মাংস খেতে পারবে। মাংস থেকে চর্বি বাদ দিয়ে সচেতনভাবে উপরোক্ত পরিমাণ গ্রহণ করা। সপ্তাহে দুই-তিন দিন সর্বোচ্চ খেতে পারবে।
উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল : উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে গরু-খাসির মাংস না খাওয়াই উত্তম। তবে উৎসবের দিন খেতে চাইলে খুব অল্প পরিমাণে খাওয়া যাবে। মাংসের গায়ের সাদা চর্বি আলাদা করে কেটে নিয়ে তারপর ওই মাংস রান্না করে ঝোল বাদ দিয়ে খেতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ যাদের আছে তারা দৈনিক সর্বোচ্চ ৬৪ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করতে পারবে।
হৃদরোগ বা স্থূলতা : হৃদরোগ ও স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য গরু ও খাসির মাংস খাওয়া উচিত নয়। তবে গরু বা খাসির মাংসের গায়ে যে সাদা চর্বি লেগে থাকে, সেটা বাদ দিয়ে কম তেলে রান্না করে বা কাবাব করে ঝোল ছাড়া পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যাবে। কিডনি রোগ : কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে, লাল মাংসে সোডিয়ামের পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে। গরু বা খাসির মাংস যদি একবেলা খেতেই হয়, তাহলে সেটি কম লবণ দিয়ে রান্না ও ঝোল বাদ দিয়ে খেতে হবে।
গ্যাস্ট্রিক ও আলসার : গ্যাস্ট্রিক ও আলসার আক্রান্ত ব্যক্তিদের গরু বা খাসির মাংস একেবারে কম খেতে হবে কারণ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পাকস্থলীতে অমেøর ক্ষরণ বাড়ায় ও এতে করে ব্যক্তির চরম অস্বস্তি হয়।
অ্যালার্জি : যাদের গরু বা খাসির মাংসে অ্যালার্জি আছে তাদের এ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলাই উত্তম। তারপরও খেতে চাইলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পাশাপাশি ওষুধ সেবন করতে হবে।
কোষ্ঠকাঠিন্য ও কোলন ক্যানসার : অতিরিক্ত গরুর মাংস খেয়ে খেলে বাড়ে কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পরবর্তীকালে আরও বড় অসুখ দেখা দিতে পারে। গরুর মাংসের সঙ্গে নানা ধরনের সবজি বা সালাদ মিলিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যাবে। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পরবর্তী সময়ে কোলন ক্যানসার ও পাইলসে আক্রান্ত হয়।
ইউরিক অ্যাসিড : যাদের রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি, তাদের গরুর মাংস না খাওয়া ভালো। তবে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে পরিমিত পরিমাণে গরুর মাংস খাওয়া যাবে।