অবহেলায় সংক্রমণ অবহেলায় প্রাণহানি

অসুস্থ শিশু কোলে নিয়ে স্বজনের ছোটাছুটি, চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আকুতি আর ক্ষণে ক্ষণে মৃত সন্তান জড়িয়ে গগণবিদারী কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে দেশের হাসপাতালগুলো। দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে নিয়ন্ত্রণে থাকা এ প্রাদুর্ভাব এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল।

এবারের মতো এত মৃত্যু ও ব্যাপক সংক্রমণের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। এজন্য টিকা নিয়ে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলাকে সবাই দায়ী করছেন। বিশ^ব্যাপী শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইউনিসেফ গত বুধবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, টিকা সংকটের বিষয়ে তারা ১০টি বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল। শুধু তাই নয়, অন্তত পাঁচবার চিঠিও দিয়েছিল। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ৬৯ দিনে ৫১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৮৬ জন হামে এবং হামের উপসর্গ ছিল ৪২৬ জনের। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৭ জনের বেশি মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। এদের একজন হামে এবং ১২ জনের হামের উপসর্গ ছিল বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ৯৬৭ জন। এ নিয়ে দেশে গত ৬৯ দিনে হামের উপসর্গের রোগীর সংখ্যা ৬২ হাজার ৫০৭ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৯০৬ জন উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬৫ জনের। এ নিয়ে হাম শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৪৯৪ জন। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১২৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৪৫ হাজার ১১ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৭১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ৬৫২ জন। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৭৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান জানান, ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ১৬ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৩৫২ জন। নিশ্চিত হাম রোগী ৩ হাজার ৬৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ১২৯ জন এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ১০ হাজার ৪৯৬ জন।

জানা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ দিনে ২০৮ জনের মৃত্যু হয়। আর ৪ মে পর্যন্ত ৫০ দিনে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩১১ জন।

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর মৃত্যু ও এত ব্যাপক সংক্রমণের নজির দেশে এর আগে নেই। এর আগে দেশে সর্বোচ্চ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, তখন আক্রান্ত ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ অনেক কমে আসে। বিগত পাঁচ বছরে রোগী শনাক্ত কোনো বছরই ৫০০ ছাড়ায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে।

আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হামে আক্রান্ত হওয়াই নয়, রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার পরও অনেক শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, কানের সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কের জটিলতাসহ বিভিন্ন সেকেন্ডারি সংক্রমণে ভুগছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে হাম ভালো হওয়ার পরও সেকেন্ডারি ইনফেকশন ও নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হচ্ছে। আগে ধারণা ছিল ৬ থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীরে মায়ের দুধের মাধ্যমে ইমিউনিটি থাকে। কিন্তু এখন সেই বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এর বড় কারণ অপুষ্টি ও বুকের দুধ না পাওয়া।

হামে আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বেশিরভাগ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে তিনি বলেন, হামে মৃত্যুরও অন্যতম কারণ পুষ্টি ঘাটতি। পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুরা হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। বেশিরভাগই হাম থেকে পরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের সঠিকভাবে আইসোলেশন করতে না পারায় ছড়িয়েছে হাম। নানা সমস্যার কারণে হাম এবার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জর্জরিত করেছে।

মায়েদের পুষ্টির বিষয়ে বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু শিশুদের টিকা দিলে হবে না, মায়েদেরও টিকা দিতে হবে। এটা করতে হবে টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগে যাদের হাম হচ্ছে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। মাকে যদি গর্ভবতী হওয়ার আগে টিকা দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ওই সন্তান ইমিউনিটি নিয়ে জন্মাবে। গর্ভকালীন টিকা দেওয়া যাবে না, দিতে হবে আগে।

হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু করে। ১২ এপ্রিল শুরু করে চারটি সিটি কপোরেশেন এলাকায়। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু করে। ১৯ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৯৭ লাখ ৮ হাজার ২৪৮ জনকে টিকা দেওয়া হয়। সব জায়গায় শতভাগের ওপরে কাভারেজ হলেও রংপুরে কাভারেজ হয়েছে ৯৮ শতাংশ।