যশোরের শার্শায় তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দুদিন আগে গ্রেপ্তার হন আলম গাজী নামে এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে মাদক সেবন ও কারবারের তথ্য পায় পুুলিশ। আলম গাজী বাংলা মদ ও ইয়াবা সেবন করে শিশুদের টার্গেট করতেন। এর আগেও দুটি শিশুকে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন তিনি। রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত শিশু রামিসা হত্যাকান্ডের অভিযুক্ত সোহেল রানাও মাদকাসক্ত। গত শুক্রবার সিলেট নগরীর কোতোয়ালি মডেল থানার পাশে আসাদুল আলম নামে একজন মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন র্যাব সদস্য ইমন আচার্য।
এ তিনটি ঘটনার মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় অভিযুক্তদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। এ ছাড়া তারা ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করছে। সম্প্রতি পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের গোপন জরিপেও উঠে এসেছে এমন তথ্য। জরিপে সতর্কবার্তা জারি করে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে।
মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত সিন্থেটিক মাদক ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব মাদক সেবনের পর তাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা, হ্যালুসিনেশন ও অতিরিক্ত মাত্রায় হাইপার-অ্যাক্টিভিটি তৈরি করছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে একজন আসক্ত ব্যক্তি খুব সহজেই যেকোনো নৃশংস অপরাধ ঘটিয়ে ফেলছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিশু সুরক্ষায় পৃথক কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন তারা।
মাদকের সহজলভ্যতায় বাড়ছে ধর্ষণ-হত্যা : পুুলিশ সূত্র জানায়, দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক এমন ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত দুই সপ্তাহেই ধর্ষণের পর তিন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে শিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, তার কারণ হিসেবে মাদকের সহজলভ্যতাকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, পরিত্যক্ত স্থানে গড়ে ওঠা মাদকের আড্ডার যুবকরাই পরে দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়। মাদকের টাকা জোগাড় করা এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দলবদ্ধভাবে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে তারা। মাদকাসক্তদের পর্নোগ্রাফি আসক্তি সাধারণের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, যা তাদের ধর্ষণের মতো অপরাধে উদ্বুদ্ধ করে। তা ছাড়া মাদকের টাকার জন্য সন্তান কর্তৃক পিতামাতাকে হত্যা, অথবা নেশার ঘোরে স্ত্রীকে খুন করার মতো ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। পুলিশের ডায়েরিতেও এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৩ সালে ঢাকার শান্তিনগরে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীকে তাদের কন্যা ঐশী রহমান নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঐশী মারাত্মকভাবে ইয়াবায় আসক্ত ছিল। মাদকের টাকার জন্য ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায় ঐশী।
পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি এবং কবরস্থানের আশপাশে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাংকে প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করতে দেখা যায়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, পুরান ঢাকাসহ রাজধানীজুড়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের। তারা প্রকাশ্য কুপিয়ে লোকজনকে হত্যা করে রাস্তার পাশে ফেলে রাখছে। অনেকের দেহ থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তা ছাড়া ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা।
পুলিশের জরিপে সতর্কবার্তা : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, পুলিশের বিভিন্ন সময়ের সমীক্ষা ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতায় অধিকাংশের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী মাদক। মাদক কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটায় না, বরং তার ভেতরের অপরাধপ্রবণতাকে উসকে দিয়ে সমাজকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ সংক্রান্ত মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে অপরাধ পরিসংখ্যানের বিশদ তথ্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি ও নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অপরাধের ধরন ও নৃশংসতা উভয়ই আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। মাদকাসক্তের ফলে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। ফলে অবলীলায় তারা জড়িয়ে পড়ছে খুন, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো জঘন্য অপরাধে। পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সময়ের মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের অপরাধ জগতের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ঘটনার পেছনে মূলচালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে মাদক। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের একটি বিশাল অংশই মাদকাসক্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
নেশার টাকা জোগাড়ে ডাকাতি-লুটপাট : পুলিশের জরিপে আরও বলা হয়, মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকের টাকা জোগাড় করতে ঘরের জিনিসপত্র চুরি থেকে শুরু করে একপর্যায়ে ডাকাতি ও খুন করতেও দ্বিধা করছে না। পরিবার টাকা না দিলে শুরু করে সহিংসতা। ফলে তাদের হাতে প্রায়ই মা-বাবা, ভাইবোন বা স্ত্রী খুনের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া মাদক সেবনের ফলে তাদের মনে তীব্র সন্দেহবাতিকতা তৈরি হচ্ছে। অনেক স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে স্ত্রীকে পরকীয়া সন্দেহে পিটিয়ে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করছে। নেশার টাকার জন্য কিশোররা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও তুচ্ছ কারণে হত্যাও করছে। মাদকের কারণে শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে তা নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ধ্বংস করছে। যুবসমাজ, যারা দেশের চালিকাশক্তি, তারা মাদকাসক্ত হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় রাষ্ট্র এক বিশাল মানবসম্পদ হারাচ্ছে। অন্যদিকে অপরাধ বৃদ্ধির ফলে বিচার বিভাগ এবং পুলিশ প্রশাসনের ওপর মামলার জট ও কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
জরিপে নানা সুপারিশ : পুলিশের জরিপে সুপারিশে বলা হয়, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন চোরাচালান আসা বন্ধ করতে হবে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র্যাবের নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। মাদক, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো মামলাগুলোর দ্রুত বিচারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে সমাজে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছায়। সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক শিক্ষা দিতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে তা নজর রাখতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং চালকদের জন্য নিয়মিত ‘ডোপ টেস্ট’ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
কঠোর আইন প্রয়োগ না করলে অবনতির শঙ্কা : পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত একজন ডিআইজি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকের কারণেই হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে নানা অপরাধ হচ্ছে। আমাদের জরিপেও এ তথ্য উঠে এসেছে। এর বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ না করলে আরও অবনতির শঙ্কা থাকবে। সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। একই কথা বলেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফও। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকের কারণে খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। দেশ থেকে মাদক নির্মূলে জোর চেষ্টা করছি। তবে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক প্রবেশ বন্ধ করতে না পারলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তারপরও আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। রাজনৈতিক দল, সমাজ ও অভিভাবকদের মাদক প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ করলে মাদক সেবনকারী ও কারবারিদের তৎপতা কমে আসবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শিশু ধর্ষণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে শাস্তির ভয় না পাওয়াসহ নানা কারণে অপরাধ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। সব পর্যায় থেকে অপরাধীরা চাপের মধ্যে থাকলে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।