বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের কেল্লাপোশী এলাকায় আজ রবিবার (২৪ মে) থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলা। প্রতি বছর তিথি অনুযায়ী জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবার থেকে শুরু হওয়া এই মেলা এবার ৪৭০ বছরে পা দিল। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবারও ব্যাপক আয়োজনে এই মেলার শুরু হয়েছে।
এ মেলাকে কেন্দ্র করে জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন। তারা মেলা থেকে সবচেয়ে বড় মাছ ও খাসি কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান। শ্বশুররা জামাইদের মোটা অঙ্কের সেলামি দিয়ে বরণ করেন। স্থানীয়রা এই মেলাকে ভালোবেসে ‘জামাইবরণ’ মেলা নামেও ডাকেন।মেলায় বসেছে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট। কাঠের আসবাবপত্র, মিষ্টি, ফলমূল, বড় মাছ, কুটির শিল্পসামগ্রী, রকমারি মসলা ও নানা রকমের পণ্যে ভরপুর হয়েছে মেলার মাঠ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে আগত বিক্রেতারা তাদের পণ্য নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন।
কেল্লাপোশী মেলার পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক কাহিনি। কথিত আছে, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এই মেলার সূচনা হয়। সেই সময় বৈরাগ নগরের বাদশা সেকেন্দারের একজন ঔরসজাত পুত্র গাজী মিয়া ও দত্তক পুত্র কালু মিয়া রাজ্যের মায়া ত্যাগ করে ফকির-সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করে ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মণ নগরে আসেন। সেখানে রাজমুকুটের একমাত্র কন্যা চম্পা গাজী মিয়াকে দেখে মুগ্ধ হন এবং তাদের মধ্যে প্রেম গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে কালু মিয়া গাজীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মুকুট রাজার কাছে গেলে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বন্দি করেন। গাজী মিয়া এতে কষ্ট পেয়ে কেল্লাপোশী নামক স্থানে একটি দুর্গ নির্মাণ করে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং ভাইকে মুক্ত করে রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। ওই দিন ছিল জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবার। সেই আনন্দঘন দিন উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী উৎসব পালিত হয়। সেই থেকেই কেল্লাপোশী দুর্গ এলাকায় মাজার গড়ে তোলা হয় এবং ঐতিহ্যবাহী মেলার সূচনা হয়।
মেলায় অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, কালের পরিক্রমায় এই মেলা এখন শুধু জামাইবরণ নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষক মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘এই মেলা রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড়। মেলাকে ঘিরে আত্মীয়তার ঐতিহ্যের বন্ধন আছে শত বছর ধরে। এই মেলা এলাকাজুড়ে উৎসবে পরিণত হয়। এই উৎসবকে ঘিরে আনন্দে মেতে ওঠে কুসুম্বি ইউনিয়নসহ আশপাশের ইউনিয়নের পরিবারগুলো।’
কুসুম্বি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যে দূরদূরান্ত থেকে মেয়ে ও জামাইয়েরা নাইওরে আসতে শুরু করেছে। এই মেলার আশপাশের বাড়িগুলোতে আনন্দে মেতে উঠেছে আত্মীয়স্বজনেরা।’
মেলা প্রসঙ্গে শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেলা এলাকায় নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ বছর মেলায় সার্কাস, লাঠিখেলা, মোটরসাইকেলের খেলা প্রদর্শন, শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা এবং হরেক রকম পণ্যের কেনাবেচার দোকানের অনুমোদন আছে। মেলার দিনগুলোতে মেলা চত্বরে জুয়া বা অশ্লীল কোন নাচ গানের অনুমোদন নেই। অশ্লীলতার উদ্দেশে করা প্যান্ডেলগুলো আজ পুলিশ প্রশাসন ভেঙে দিয়েছে। কাল থেকে বিশেষ টিমের নজরদারি থাকবে। জুয়া বা অশ্লীল কোনো নাচ-গান চালালে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’