এলো খুশির ঈদ

উচ্চশিক্ষার জন্য হাজারো শিক্ষার্থীকে নিজের শহর, পরিবার ছেড়ে নতুন পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় হলে বা মেসে থাকতে হয়। সেখানেই তৈরি হয় আরেকটি বৃহৎ পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই পরিবারের সদস্য। ঈদ এলে সবার মাঝেই বাড়ি ফেরার একটি আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া এবং বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবারকে ছেড়ের যাওয়ার এই মিশ্র অনুভূতি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক

ঈদ আনন্দ, বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতার অনুভব

আসলে ঈদ আনন্দের বিষয় হওয়া সত্ত্বেও ঈদ সবার জন্য সমান আনন্দ বয়ে আনে না। আত্মসামাজিক বাস্তবতা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ঈদের আনন্দ সবার কাছে সমানভাবে ছড়িয়ে যেতে পারে না। মধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে কম আয়ের মানুষ যাদের পরিবার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, তাদের অনেকেরই কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না। ফলস্বরূপ, তাদের ঈদটা অতটা আনন্দের হয় না। তাদের এই বাস্তবতা দেখে আমাদের আনন্দও পরিপূর্ণ হয় না। তখন এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কিন্তু আমরা চাইলেও হয়তো সবার জন্য কিছু করতে পারি না। অর্থাৎ একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে এসব ব্যথা-বেদনা সব মিলিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঈদ পালিত হয়।

মোহাম্মদ আনোয়ারুল ওয়াহাব শাহীন

সহযোগী অধ্যাপক, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদ হোক মানবিকতা সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা

ঈদ আমাদের জীবনে আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে। একজন শিক্ষক হিসেবে ঈদ আমার কাছে শুধু উৎসব নয়, বরং পরিবার, শিক্ষার্থী ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি বিশেষ উপলক্ষ। ঈদের সকালে পরিবারের সব নারী সদস্যকে নিয়ে নামাজ আদায়, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা, আত্মীয়স্বজনের আপ্যায়ন এভাবেই দিনটি কেটে যায়। ছোটদের আনন্দ দেখে মন ভরে যায়। নিজের ছোটবেলার ঈদ, ঈদকার্ড বিনিময় এই ব্যাপারগুলো খুব মিস করি। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে ঈদের আনন্দের মাঝেও শিক্ষার্থীদের কথা মনে পড়ে। তারা দূরদূরান্ত থেকে এসে পড়াশোনা করে। ঈদের সময় তাদের জন্যও শুভকামনা ও ভালোবাসা থাকে সবসময়।

উম্মে সালমা লুনা

চেয়ারম্যান, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদ হোক সর্বজনীন

‘ঈদ’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের আনন্দের ধরনও বদলে যায়। একসময় ঈদ মানেই ছিল সালামি পাওয়ার আনন্দ, নতুন পোশাকের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা। মনে থাকত কবে বড় ভাই বাড়ি ফিরবে আর সঙ্গে করে নিয়ে আসবে নতুন ঈদের কাপড়। যে বাবা-মায়ের কাছে ঈদ এলেই হাজারো বায়না ধরা হতো, আজ মনে হয় বাবার জন্য একটি পাঞ্জাবি আর মায়ের জন্য একটি শাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই যেন ঈদের পূর্ণতা মিলবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় চাহিদা, বদলে যায় অনুভূতিও। তারপরও প্রত্যাশা একটাই সবার ঈদ হোক আনন্দময়। সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যারা প্রিয়জনের কাছে ফিরছেন, তারা যেন নিরাপদে  ঈদ উদযাপন করতে পারেন।

মুনজুরুল ইসলাম

দ্বিতীয় বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বাড়ি ফেরার আনন্দই ঈদ আনন্দ

ছোটবেলায় ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই আব্বা-আম্মার কাছে নতুন কাপড়ের জন্য কত বায়না ধরতাম! কয়েক দিন আগে থেকেই পড়াশোনা বন্ধ। আর আম্মা সারাক্ষণ বলত, ঈদ এখনো দেরি আছে, পড়তে বস! চাঁদ রাতে মেহেদি দিতে সারাদিন বোনের কাছে পড়ে থাকতাম। সবার সঙ্গে হইচইয়েই মেতে থাকতাম। অথচ আজ কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল। এখন আম্মা ফোন দিয়ে বলে বাবা, ঈদ তো চলে এলো বাড়ি কবে আসবি? আমি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। এখনো যে ফেরার টিকিটটা কাটি নাই। মন চাচ্ছে খুব করে বাড়িতে গিয়ে ঈদ করি, সকালে আম্মার হাতের সেমাই খাই, কিন্তু কোনো এক অজানা বাস্তবতা যেন সব স্বপ্ন নিমিষেই ব্যস্ততার অজুহাতে কেড়ে নিচ্ছে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদের আনন্দটাও পাল্টে যায়! আগে মনে হতো ঈদে খেলাধুলা, ঘুরাফেরা করাই আনন্দ। তবে সময়ের ব্যবধানে আজ মনে হচ্ছে ঈদে বাড়ি ফেরাটাই সত্যিকারের আনন্দ।

হুমায়ুন আহমেদ নাইম

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়