দেশের কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ঋণ আদায় পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষ করে খেলাপি, বকেয়া ও ওভারডিউ ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কৃষি অর্থায়ন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ৩০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণ ছিল ২৪ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন হয়েছে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
তবে বিতরণ বাড়লেও আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালের মার্চে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১১১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় চার গুণ বা ২৮৯ শতাংশের বেশি।
সবচেয়ে বেশি খেলাপি বেড়েছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে। এ খাতে শ্রেণিকৃত ঋণ ২ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপিও বেড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর খেলাপিঋণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কোনো শ্রেণিকৃত কৃষিঋণ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কৃষিখাতে ওভারডিউ ঋণও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে ওভারডিউ ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৬ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকায়। একই সময়ে মোট বকেয়া ঋণ ৩৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কৃষি খাতেও ব্যাপকহারে বেনামি ও রাজনৈতিক প্রভাবের ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। সেই ঋণের বড় অংশ এখন আর আদায় হচ্ছে না এবং ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন পুরো কৃষি অর্থায়ন ব্যবস্থায় পড়ছে।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এ খাতে বিতরণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮১১ কোটি টাকায়। মোট বিতরণের ৪২ শতাংশই এসেছে এ খাত থেকে।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটি ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ ছাড়া রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বিতরণ করেছে ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংক ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংক ৫৪৭ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি একাই ২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা এ খাতে সর্বোচ্চ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট কৃষিঋণের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ফসল খাতে। এ খাতে বিতরণ হয়েছে ১৪ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণের প্রায় ৪৮ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ খাতে বিতরণ হয়েছে ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা এবং মৎস্য খাতে ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পর্ষদ সচিব হাবিবুন্নবী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়া ইতিবাচক হলেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আদায় সক্ষমতা বাড়ানো। তিনি বলেন, ‘অনেক পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের চাপ এখন সামনে চলে এসেছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি, প্রকৃত কৃষক যাচাই এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার না করলে খেলাপি পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে।’