কোরবানির অর্থনীতি এবারও চাপে

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা ছিল শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। বিগত সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সেই ভঙ্গুর অবস্থার এখনো খুব একটা উন্নতি হয়নি। এর প্রভাব পড়তে পারে এবারের ঈদুল আজহাতেও। কোরবানির হাটগুলোতে পশুর যথেষ্ট সরবরাহ থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। অর্থ সংকটের কারণে আগে যারা এককভাবে কোরবানি দিয়েছেন, তাদের অনেকেই এবারে ভাগে কোরবানি দেবেন, অনেকে হয়তো কোরবানি থেকেই সরে আসবেন, এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এবারও চাপে থাকবে কোরবানির অর্থনীতি। 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, কোরবানির জন্য এ বছর ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার পশুর সরবরাহ রয়েছে। বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ১ লাখ পশু। গত বছর একই রকম অবস্থার মধ্য দিয়ে যখন হয়েছিল, তখনো মানুষ কম কোরবানি করেছে। মাত্র ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই অর্থনীতির ক্ষত স্পষ্ট হতে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকার এই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। কিছু পদক্ষেপ নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা আরও বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থার মধ্যেই আসে নির্বাচিত সরকার। এ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা করে। ফলে তৈরি হয় জ্বালানি নিয়ে সংকট। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সারের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়ায় অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও চাপে পড়ে। সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও আদতে অর্থনীতি গতি ফিরে পাওয়ার অবস্থায় আসেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি আগের মাসের চেয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ১ কোটি ৪ লাখ কোরবানির পশু বিক্রি হয়েছিল। যার বাজারমূল্য ছিল ৬৯ হাজার ১৪১ কোটি টাকার বেশি। তবে মানুষের আয় কমে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকট, উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়াসহ নানা কারণে ২০২৫ সালে; অর্থাৎ গত বছর কোরবানি হয়েছিল মাত্র ৯১ লাখ পশু, যা তার আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১৩ লাখ কম। এ সময় পশু বিক্রি নেমে আসে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার ঘরে।

এর আগে ২০২৩ সালে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। যার মূল্য ছিল ৬৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। তার আগের বছর ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা মূল্যের ৯৯ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি পশু কোরবানি হয়েছে।

এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক চাপের কারণে এবারও গত বছরের মতোই কোরবানি কম হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সীমিত আয়ের সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটা শ্রেণির মানুষকে কোরবানি থেকে দূরে রাখতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, কিছু মানুষ হয়তো আগে যে টাকা ব্যয় করে কোরবানির পশু কিনতেন, সেটা খানিকটা কমিয়ে ফেলতে পারেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ পলাতক বা নিষ্ক্রীয় থাকার প্রভাবও কোরবানির ওপর পড়তে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এ অবস্থার মধ্যে যারা বড় গরু কোরবানি দিতেন, তারা হয়তো মাঝারি গরু কিনবেন। যারা ছোট গরু কিনতেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো ভাগে কোরবানি দেবেন। যারা ভাগে দিতেন, তাদের অনেকে হয়তো কোরবানি দেবেন না অথবা একটা ছাগল বা ভেড়া কিনে কোরবানি করবেন। 

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে খামারিরাও থাকবেন চাপের মধ্যে। খাদ্য ও ওষুধের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ বেশি। আবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। অন্যদিকে বাজারে ক্রেতা কম দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় খামারি বা ব্যবসায়ীদের এবার কম লাভে পশু বিক্রি করতে হবে অথবা লোকসান করতে হবে। 

তিনি বলেন, ১ কোটি ১ লাখ গরুর যে চাহিদার কথা বলা হয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এত পশু বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

খামারিদের বর্ণনাতেও উঠে এসেছে এই পরিস্থিতির কথা। ঢাকার হাটগুলোতে আসা খামারি, ব্যাপারী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারে ছোট গরুগুলোর দাম গত বছরের তুলনায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেশি। যে গরু গত বছর ৮০ থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেই গরুগুলোই এবারে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের এবারে বড় গরুর প্রতি ঝোঁক কম দেখা গেছে। সবাই মাঝারি বা ছোট আকারের গরু কেনার চেষ্টা করছেন। 

জামালপুর থেকে নিজের ফার্মের সাতটি গরু নিয়ে খিলগাঁওয়ের শাহজাহানপুর হাটে এসেছেন মনিজ মুর্তজা। তিনি জানান,  গত ২২ মে গরুগুলো হাটে নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে অনলাইনে দুটি গরু বিক্রি হয়েছে, তবে হাটে এখনো বিক্রি হয়নি। বড় গরুটার ওজন ৬০০ কেজি, ৫ লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন। কয়েকজন দেখে সাড়ে তিন লাখ পর্যন্ত বলেছেন। ফলে বিক্রি করতে পারছেন না। অন্য বছরের চেয়ে ক্রেতাও কম মনে হচ্ছে। 

তিনি বলেন, গতবারের তুলনায় এবার ট্রাক ভাড়া বেশি পড়ছে। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে আমাদের গরু নিয়ে আসতে হয়েছে হাটে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে আমুলিয়া হাটে এসেছেন ব্যাপারী আশরাফুল। নিজের ৬০টিসহ তার পরিচিত ব্যাপারীদের ২০০টি গরু একসঙ্গে হাটে এনেছেন। এর মধ্যে দুই ট্রাকে ৩৬টি গরু এসেছে, বাকিগুলো পথে আছে। তিনি বলেন, ৩ থেকে ৪ দিনে মাত্র ৬টা গরু বিক্রি হয়েছে। এগুলো ছোট গরু। বড় ও মাঝারি গরুগুলো বিক্রি করতে পারিনি এখনো। 

মেহেরপুর থেকে আমুলিয়া হাটে গরু নিয়ে এসেছেন জিয়ারুল হক। আমুলিয়া হাট পর্যন্ত ট্রাকে ১৫টি গরু নিয়ে আসতে তার খরচ পড়েছে ৪০ হাজার টাকা। জিয়ারুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পাঁচজন মিলে ট্রাকে গরু নিয়ে এসেছি। ভাড়া গতবারের তুলনায় এ বছর ১০ হাজার টাকা বেশি পড়েছে। গত বছর এ হাটেই ২০টা গরু নিয়ে এসেছিলাম।’

বাড়তি দামের গরুর সঙ্গে বাজেট মেলানো কষ্টকর হয়ে পড়ছে ক্রেতার কাছেও। ক্রেতারা জানান, জিনিসপত্রের বাড়তি দাম, বাড়তি মূল্যস্ফীতির বিপরীতে সেভাবে আয় না বাড়ায় পশু কিনতে খানিকটা বেগ পেতে হচ্ছে। এতে করে বাজেটে কুলিয়ে উঠতে না পেরে হয়তো তুলনামূলক ছোট গরুই কিনতে হচ্ছে।

কোরবানির ঈদ ঘিরে জমজমাট হয় ফ্রিজ, মসলা ও মিষ্টি পানীয়র বাজার কোরবানির অর্থনীতিতে পশুর বাজারের বাইরেও বেশ কিছু পণ্যের বাড়তি বেচাকেনা লক্ষ্য করা যায়। এর একটি হচ্ছে ফ্রিজ। দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ ইউনিট ফ্রিজ বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ লাখ ইউনিট বিক্রি হয় রমজান ও কোরবানি ঈদে। তবে এ দুই ঈদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় কোরবানি ঈদ ঘিরে। এ সময় বিক্রি হয় প্রায় ৬৫ শতাংশ বা প্রায় ১২ লাখ ইউনিট ফ্রিজ।

রোজার ঈদের উদযাপন নতুন পোশাক ছাড়া চিন্তাই করা যায় না। তবে নতুন পোশাকের এই ক্রেজ একেবারেই তলানিতে নেমে আসে কোরবানির ঈদে। রোজার ঈদের আগের রাত পর্যন্ত শপিংমলগুলো মানুষে ভরা থাকলেও এ সময় পোশাকের দোকানগুলোতে ভিড় দেখা যায় না। যদিও অল্প পরিসরে পোশাকের কেনাবেচা থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

তবে কোরবানিতে ব্যাপক কেনাবেচা করতে দেখা যায় নানা পদের মসলা। কোরবানির মাংসের রান্না মুখরোচক করতে সামর্থ্য অনুযায়ী সীমিত আয়ের মানুষও মসলা কেনে। এতেই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। পেঁয়াজ, রসুন ও আদার মতো নিয়মিত ব্যবহৃত মসলাগুলোর চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতাসহ বিভিন্ন মসলার কদর বেড়ে যায়। এ সময় অন্তত মসলা, পোশাক মিলিয়ে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানান খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

এর সঙ্গে ঈদে চাহিদার শীর্ষে থাকে মিষ্টান্ন, কোমল পানীয়। ঈদের দিনে সেমাই, পায়েস, নানা পদের পিঠা বাসাবাড়িতে রান্না হলেও ঘরে ঘরে সামর্থ্য অনুযায়ী দই-মিষ্টি খাওয়ার একটা প্রচলন রয়েছে। বছরের অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদের দই-মিষ্টির দোকানগুলোতে থাকে বাড়তি ভিড়।

মিষ্টান্নের বাজারে বর্তমানে শহরগুলোতে ব্র্যান্ডেড দোকানগুলোতে বাহারি পদের দই-মিষ্টি থাকলেও এখনো এলাকাভিত্তিক দোকানগুলোর মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি দই-মিষ্টি বিক্রি হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে এ বাজার ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যেখানে আবার শুধু নানা পদের দইয়ের বাজারই ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে বাংলাদেশ সুইট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য থেকে জানা যায়। জানা গেছে, দেশে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি মিষ্টির দোকান রয়েছে, যেখানে ২০ হাজারের বেশি মিষ্টির দোকান রয়েছে নন ব্র্যান্ডেড। এ বাজারটার সঙ্গে অবশ্য সরাসরি জড়িত আবার দুধের বাজার। দই-মিষ্টির বাড়তি চাহিদার কারণে দুগ্ধ খামারিরাও ভালো দাম পান। এ ছাড়া কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে একটা বড় বিক্রি দেখা যায় কোমল পানীয়র। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক এ সময়টাতে ৩০ শতাংশ বাড়তি কোমল পানীয় বিক্রি হয়।

এর সঙ্গে তো রয়েছে চামড়ার বড় বাজার। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোরবানির পশুর বিক্রির ওপরই আসলে নির্ভর করে অন্য সব পণ্যের কেনাকাটা। ফলে একটি চাপে থাকলে অন্য ব্যবসাগুলোও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।