ভারতের জ্বালানি তেলে ‘অস্থিরতা’

উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। মূলত গত প্রায় ৩ মাস ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশে দেশে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহ অর্থনীতির দেশ ভারতেও এ সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে। গতকাল সোমবার ভারতের দিল্লিতে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২.৬১ রুপি এবং ডিজেলের দাম ২.৭১ রুপি বাড়িয়েছে দেশটির সরকারি তেল বিপণন কোম্পানিগুলো (ওএমসি)। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে ভারতে ১০ দিনের ব্যবধানে চারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল। গত দুই সপ্তাহে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৭.৩৫ রুপি এবং ডিজেলের দাম ৭.৫৩ রুপি বেড়েছে। সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর দিল্লিতে এখন লিটারপ্রতি পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ১০২.১২ রুপি এবং ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ৯৫.২০ রুপিতে। গত চার বছরের মধ্যে এই প্রথমবার দিল্লিতে খুচরা বাজারে পেট্রোলের দাম ১০০ রুপির ঘর ছাড়াল। এর আগে ২০২২ সালের ২১ মে শেষবার পেট্রোলের দাম ১০৫.৪১ রুপিতে উঠেছিল।

গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৩.৫৪ ডলার। তবে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের শিগগিরই অবসান হতে পারেÑ এমন সম্ভাবনার তথ্য আসার পর সোমবার লেনদেনের শুরুতে এই দাম বেশ খানিকটা কমে ৯৯.৩৬ ডলারে নেমে আসে। এই সংঘাত থামলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। তবে ভারতের শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম ধাপে ধাপে বাড়ানোর এ ধারা খুব শিগগিরই থামার সম্ভাবনা নেই। কারণ, সরকারি তেল কোম্পানিগুলো কেবল পেট্রোল ও ডিজেলের বর্তমান লোকসানই কমাচ্ছে না, বরং এর আগে অটো ফুয়েল এবং রান্নার গ্যাসে যে ক্ষতি হয়েছিল, সেটিও তারা এখন পুষিয়ে নিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানান, বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই সরকারি তেল কোম্পানিগুলো দাম বাড়ায়নি; অথচ ওই সময় তেলের দাম হু হু করে বাড়ছিল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭২.৮৭ ডলার, যা ৯ মার্চ প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতে, চারবার দাম বাড়ানোর পর তিনটি সরকারি তেল কোম্পানির পেট্রোল ও ডিজেলে লোকসান প্রতি লিটারে ১০ রুপির নিচে নেমে এসেছে। তবে কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক প্রকাশ না করে দাবি করেছেন যে তাদের লোকসান আরও বেশি। বিশ্লেষকদের ধারণা, তারা হয়তো এলপিজি বিক্রির লোকসানও এর সঙ্গে যোগ করছে।

লোকসান কমাচ্ছে কোম্পানিগুলো : ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর ফলে কোম্পানিগুলোর লোকসান কমছে। গত ১৫ মে প্রথমবার দাম বাড়ানোর আগে এই তিনটি কোম্পানির দৈনিক সম্মিলিত লোকসান ছিল প্রায় ১ হাজার কোটি রুপি। ১৯ মে দ্বিতীয়বার দাম বাড়ানোর পর তা কমে ৭৫০ কোটি রুপিতে দাঁড়ায়। আর সোমবারের মূল্যবৃদ্ধির পর এই লোকসান ৫০০ কোটি রুপির নিচে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে এবং সবচেয়ে আদর্শ পরিস্থিতি হিসেবে ৭০ ডলারের কাছাকাছি স্থির না হলে পঞ্চম দফায় দাম বাড়ানোর জোর সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড ১০৩.৫৪ ডলারে লেনদেন শেষ করে, যা ওই দিনের হিসেবে দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। তবে এটি ১৫ মে প্রথমবার দাম বাড়ানোর সময়ের (১০৮ ডলারের ওপরে) চেয়ে কম।

মহানগরগুলোতে জ্বালানির নতুন দাম : সবশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর দিল্লিতে এখন পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২.৬১ রুপি বেড়ে ১০২.১২ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। আর ডিজেল ২.৭১ রুপি বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯৫.২০ রুপিতে। দিল্লির মতো অন্যান্য মহানগরেও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। কলকাতায় ২.৮৭ রুপি বেড়ে পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ রুপিতে। মুম্বাইয়ে ২.৭২ রুপি বেড়ে ১১১.২১ রুপি এবং চেন্নাইয়ে ২.৪৬ রুপি বেড়ে ১০৭.৭৭ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল। অন্যদিকে কলকাতায় লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ৯৯.৮২ রুপি, মুম্বাইয়ে ৯৭.৮৩ রুপি এবং চেন্নাইয়ে ৯৯.৫৫ রুপি। এই শহরগুলোতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি যথাক্রমে ২.৮০, ২ .৮১ এবং ২.৫৭ রুপি বেড়েছে। উল্লেখ্য, স্থানীয় কর বা শুল্কের ভিন্নতার কারণেই শহরভেদে জ্বালানির দামে এমন পার্থক্য দেখা যায়।