‘মৃত্যুর মতো এত স্নিগ্ধ, এত গভীর, সুন্দর আর কিছু নেই। কারণ, মৃত্যু অনিবার্য। তুমি যখন জন্মেছ, তখন তোমাকে মরতেই হবে। মৃত্যুর বিষয়টি মাথায় থাকলে কেউ পাপ করবে না। যেটা অনিবার্য, তাকে ভালোবাসাটাই শ্রেয়। মৃত্যুকে ভয় পাওয়াটা মূর্খতা। জ্ঞানীরা মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করো, গ্রহণ করো, বরণ করে নাও।’
কথাগুলো বলেছিলেন, দেশের অভিনয় জগতের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হুমায়ুন ফরিদী। কেবল নামজাদা অভিনেতা হিসেবেই নয়, এরকম অনেক উক্তির মাধ্যমেও স্মরণীয় হয়ে আছেন এই কিংবদন্তি। অভিনেতাদের আইকন হুমায়ুন ফরিদীর ৭৩তম জন্মদিন আজ (২৯ মে)।
১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার নারিন্দায় তিনি জন্ম গ্রহণ করেন হুমায়ুন ফরিদী। তবে জন্ম ঢাকায় হলেও শৈশব-কৈশোর তার কেটেছে ঢাকায় বাইরে। বাবার চাকরির সুবাদে ঘুরতে হয়েছে মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ আরও অনেক জেলায়। যে কারণে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনাও হয়েছে তার বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন স্কুলে। চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করেন ১৯৭০ সালে। স্বাধীনতার পর অর্থনীতি নিয়ে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে অনার্স সম্পন্ন করেন।
তবে ছেলেবেলা থেকেই অভিনয়ে ঝোঁক ছিল তার। তাই অর্থনীতিতে এতো ভালো ফলাফল করেও পেশা হিসেবে বেছে নেন অভিনয়কে। আশির দশকে নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড়পর্দায় পা রাখেন হুমায়ুন ফরীদি। পরবর্তীতে বাংলা সিনেমার জগতে এক অধ্যায় হয়ে ওঠেন তিনি। একে একে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান হুমায়ুন ফরীদি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করেন।
হুমায়ুন ফরীদির অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘ভণ্ড’, ‘ঘাতক’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘টাকার অহংকার’, ‘অধিকার চাই’, ‘সন্ত্রাস’, ‘দহন’, ‘লড়াকু’, ‘দিনমজুর’, ‘বীর পুরুষ’, ‘বিশ্ব প্রেমিক’, ‘আজকের হিটলার’, ‘দুর্জয়’, ‘শাসন’সহ অসংখ্য সিনেমা উপহার দিয়েছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রে।
এছাড়া অভিনেতার উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নিখোঁজ সংবাদ’, ‘হঠাৎ একদিন’, ‘পাথর সময়’, ‘সংশপ্তক’, ‘সমূদ্রে গাংচিল’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মোহনা’, ‘নীল নকশাল সন্ধানে’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান হুমায়ুন ফরীদি। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬০। হুমায়ুন ফরীদির প্রয়াণে যে শূণ্যতা তৈরি হয়েছে ঢালিউড চলচ্চিত্রাঙ্গনে, সেটা অপূরণীয়।
জীবনে অনেক পাগলামি করেছেন হুমায়ুন ফরীদি। এক সাক্ষাৎকারে খাবার নিয়ে মজাচ্ছলে গল্প বলেছেন ভক্তদের কাছে। কই মাছের গল্প দিয়ে সাক্ষাৎকারটি শুরু করেন অভিনেতা। গল্পটা অনেকটা এ রকম, হুমায়ুন ফরীদি সিনেমা নিয়ে তখন দারুণ ব্যস্ত। সেটে একদিন বাবুর্চি অভিনেতার কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কী খাবেন দুপুরে? হুমায়ুন ফরীদি উত্তরে বলেছিলেন, তোমরা যা দাও, তখন বাবুর্চি বলে উঠলেন, আপনি কখনো কিছু বলেন না, আপনি কিছু বলেন, আমরা সেটা বানাই। তখন হুমায়ুন ফরীদি বাবুর্চিকে বলেন, ‘ভাই কই মাছ খাওয়াইও যদি পারো।’ এর পর থেকে সিনেমার শুটিং থাকলে হুমায়ুন ফরীদির জন্য কই মাছ থাকতই। শুধু সিনেমাতেই নয়, নাটকেও কই মাছই পরিবেশন করা হতো প্রিয় অভিনয়শিল্পীর জন্য।
ঝাল পছন্দ হুমায়ুন ফরীদির। এমনকি অবাক তথ্যও দিয়েছিলেন শিল্পী। তিনি বলেন, বিদেশে গেলেও আমার পকেটে কাঁচা মরিচ থাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ে বন্ধুর বোন খাবার নিয়ে গিয়েছিল, বন্ধু গোসলের পর খাবেন, তার আগেই বন্ধুদের নিয়ে হুমায়ুন ফরীদি সেই খাবার খেয়ে সাবাড় করে খালি বক্স রেখে এসেছিলেন বন্ধুর রুমে। এমনকি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ঈদে কোরবানির জন্য কেনা স্যারের গরুও চুরি করেছেন বন্ধুরা মিলে। সেই গরু সাভার থেকে কসাই এনে ২০ জনের জন্য ১৫ কেজি রান্না করা হয়েছিল, বাকিটা স্যারকে দিয়েছিলাম। সার তো হতভম্ব। ঈদের দিন সকালেই নতুন গরু কিনেছিলেন তিনি।
হুমায়ুন ফরীদি বলেন, মানুষের ভালোবাসা, ছবি তোলা, অটোগ্রাফ এগুলোর জন্য সচরাচর বাইরে যাওয়া হতো না। তবে মানুষ এমন না করলেও খুব খারাপ লাগবে। মঞ্চ থেকে অভিনয়ে আসার যাত্রাটাও ভক্তদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন তিনি। হুমায়ুন ফরীদি বলেন, অভিনয়ে আসার পেছনেও গল্প আছে। চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম অনুষ্ঠান করতে, তখন আফজালরা তারকা, তাদের জন্য এসেছিল মার্সেডিজ, আর আমাদের জন্য টেম্পো। এটা দেখে আঘাত পেয়েছিলাম। এমন বৈষম্য মানতে পারিনি। রাতে খাওয়ার পর আফজালকে বললাম, আমাকে নায়ক হতে হবে, সে বলল কেন বন্ধু?
তোকে এত দিন ধরে বলেছি কর! আমি বললাম, তোদের জন্য এসেছে মার্সেডিজ, আমাদের জন্য টেম্পো। যদিও সবাই আমাদের সঙ্গে টেম্পোতেই এসেছিল, মার্সেডিজে কেউ উঠে নাই। আমি বললাম, অভিনয় করব। আফজাল ঢাকায় এসে পরপর চার-পাঁচটা নাটক করল আমাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রে। তারপর টেলিভিশন তারকা বা হিরো হয়ে গেলাম। যদিও কখনো হিরো হতে চাননি, বরং অভিনয়শিল্পী হতে চেয়েছিলেন সবার প্রিয় হুমায়ুন ফরীদি।