শহীদ জিয়া আমাদের আত্মার সঙ্গী

স্বাধীনতার মহান ঘোষক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান এর আজ ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা আমাদের দিয়েছেন আত্মপরিচয়ের মহাসড়ক।আর আমরা বহণ করে চলেছি তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার লোকজ আদর্শ। তার এই আদর্শ জাতি-ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে এক অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই  ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। তিনি নির্মাণ করে গেছেন এমন এক সম্প্রীতির চাদর, যা আমাদের লালন-পালন করছে দেশপ্রেমিকের সাহসে ও মর্যাদায়। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার যে আকাঙ্খা ও সংগ্রাম আমরা পেয়েছি, তার মন্ত্রণারই বাহক আমরা। আজ সেই মহান রাজনৈতিক চিন্তকের প্রতি আমরা জানাই  শ্রদ্ধা ও সালাম। স্বাধীনতার অমর বোধের সঙ্গে আমরা তাকে স্মরণ করছি। তিনি অমর হয়ে আছেন আমাদেরই চেতনার লোকজ সম্পদে। 

এ দেশের মানুষ আর তাদের বোধে ও বাস্তবতায় যে সাংস্কৃতিক ফল্গু প্রবহমান, তিনি তাকেই আবিষ্কার করেছেন সম্প্রীতির বন্ধনের আলোকে, বললেন আমরা বাংলাদেশি, আমরা কেবল বাঙালি নই। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের সত্তায় চলমান বাস্তবতা হলেও সাংস্কৃতিক সজ্জায় আমরা লালন করি সমগ্র মানুষের আশা-আকাঙ্খার আলোকমালা, যা বাংলাদেশি পরিচয়ে পরিপূর্ণতা পায়।

আবার এই সত্যই আমাদের চেনায় যে, যে ভূ-খণ্ডের অধিবাসী আমরা, সেই সীমানাও তো রাজনৈতিক ভাবেই স্বাধীন। দেশের সীমানাকেন্দ্রিক পরিচয় থেকেও আমরা বাংলাদেশি। এটা আমরা বুঝেছি সাংস্কৃতিকভাবে, তেমনি আর্থ-সামাজিক ভাবেও। ভাষিক সত্তাকেও আমরা লালন-পালন করি সেই আলোকেই। আমরা আলোকিত হই সেই সূত্রে, সেই প্রবাহের নানা বর্ণিল স্রোতে।

২.

কবিতায় কি সবকিছু উঠে আসে? কিংবা গদ্যে? প্রবন্ধমালায়? আমরা যদি কবিতা, প্রবন্ধ/নিবন্ধ আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলোকে শহীদ জিয়ার চিন্তাকে বিচার করি, তাহলেও দেখবো, তিনি আমাদের সেই চিন্তাই মুক্ত করেছেন, যা আমরা বহন করি। এ জিজ্ঞাসা অনেকের মনেই জাগতে পারে। হয়তো আসে, হয়তো আসে না। কবিতার ভাষাও তাতে নিহিত আবেগের ফল্গু আমাদের চেতনাকে স্নাত করে। আমরা স্নান করে উঠি সেই ধ্বনির কল্লোলে। নেচে উঠি প্রকৃতির মতো উচ্ছাসে। শহীদ জিয়া মিশে আছেন এদেশের প্রকৃতিতে, সমাজের পরতে পরতে। উৎপাদিত ফসলের সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে তিনি জয় করেছেন মেহনতি কর্মবীর মানুষকে আপন সজ্জায়।

প্রতিটি বর্ণ, অক্ষরের স্বাদ যেন ধ্বনিত হয় ওঠে কবিতার চিত্রে ও চিত্রকল্পে।  সেই সুর, যা শহীদ জিয়ার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ১৯৭১ সালে আমরা খুব নিচু স্বরে শুনেছিলাম রেডিওতে আমি মেজর জিয়া বলছি, আত্ম পরিচয় কী আমাদের? তা তিনি খুব ভালো বুঝেছিলেন। মিলেমিশে একাত্ম হয়ে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন তিনি। বুঝেছিলেন, খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে না পারলে কোটি কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেয়া সহজ হবে না। তিনি তাই শুকনো মৌসুমে খালে-বিলে, নদীতে সেচের পানি সংরক্ষণের জন্য খাল-কাটা কর্মসূচি নিয়েছিলেন।

তিনি নিরক্ষতা দূর করতে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। শিশুদের বর্ণ পরিচয়ের উদ্বোধন করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় করে শিশুদের শিক্ষার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। যুবকদের বেকারত্ব দূর করতে যুব মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করেন তিনি, তাদের কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী করে তোলার ব্যবস্থা করেছিলেন।এতেই গড়ে উঠেছিল নতুন করে বাঁচার সাংস্কৃতিক প্রণোদনা। নতুন বাংলাদেশ। তাইতো তিনি নতুন বাংলাদেশের নির্মাতা।  

মেয়েদের শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাগিদ দিয়েছেন তিনি প্রাথমিক শিক্ষার শুরু থেকেই। নারীর ক্ষমতায়নের ধারা বেগম খালেদা জিয়া পেয়েছিলেন তার কাছ থেকেই, যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে। তিনি নারীর ক্ষমতায়নের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষা নেবার অধিকারকে তিনি বাস্তবায়ন করেছেন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যা কিছু চমকপ্রদ কাজ করছেন, যা কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার পেছনেও আছে শহীদ জিয়ার মানবিক মানসিক প্রণোদনা, উৎসাহ। তার সব ধারণাই শহীদ জিয়ার উত্তরসূরী হিসেবে পেয়েছেন। সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার মৌল ধারাও তিনি নিয়েছেন ওই পরম্পরা থেকে।  

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের  উদ্গাতা এই কর্মবীরকে আমরা আমাদের সৃষ্টিশীল পৃথিবীর আকর হিসেবে চিনেছি। তার প্রতি, তার বিদেহী আত্মার প্রতি আমরা বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই আজ তার প্রয়াণ দিবসে। সময় গড়িয়ে চলে। কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে অনেক কিছু। কিন্তু শহীদ জিয়া থাকবেন তার সাহসী স্বাধীনতার ঘোষণা আর মুক্তিযুদ্ধের অনন্য অবদানের জন্য। তিনি আজ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের আইকনিক চরিত্র।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক