সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গাজার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি উচ্চাভিলাষী ‘মাস্টার প্ল্যান’ উপস্থাপন করেন। পরিকল্পনায় আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন, পর্যটন নগরী, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলা হয়। কুশনারের দাবি, ২০৩৫ সালের মধ্যে গাজার অর্থনীতি ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে এবং সৃষ্টি হবে পাঁচ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান।
তবে সমালোচকদের মতে, পরিকল্পনাটি গাজার বাস্তব পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে এখনো কোটি কোটি টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়নি, হাজার হাজার অবিস্ফোরিত বোমা ছড়িয়ে রয়েছে, ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং লাখো মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় ফিলিস্তিনি জনগণের মতামত নেওয়া হয়নি। কোথায় মানুষ বসবাস করবে, কীভাবে চলাচল করবে কিংবা কী ধরনের সমাজ গড়ে উঠবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই।
গাজার বাসিন্দা নূর আলসাক্কা বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্য, জ্বালানি, পানি ও ওষুধের সংকট। তিনি বলেন, 'মানুষ বেঁচে থাকার লড়াই করছে, আর বাইরে থেকে তাদের জন্য বিলাসবহুল নগরীর স্বপ্ন আঁকা হচ্ছে।'
নিবন্ধে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি নতুন সংস্থা গাজার পুনর্গঠন তদারক করবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা যুক্ত থাকলেও প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত ট্রাম্পের হাতেই কেন্দ্রীভূত।
সমালোচকদের অভিযোগ, এই কাঠামো জাতিসংঘভিত্তিক প্রচলিত পুনর্গঠন ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে গাজাকে একটি নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার, ভূমির মালিকানা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন উপেক্ষিত হতে পারে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সারা রয়ের মতে, গাজার পুনর্গঠনের আড়ালে ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করার লক্ষ্যও থাকতে পারে। অন্যদিকে মানবাধিকার আইনজীবী জাহা হাসান বলেন, 'এই পরিকল্পনা সত্যিকার অর্থে ফিলিস্তিনিদের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য তৈরি হয়েছে—এমন বিশ্বাস করতে হলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের পুরো ইতিহাস ভুলে যেতে হবে।'
নিবন্ধে উপসংহারে বলা হয়েছে, গাজার মানুষের জন্য পুনর্গঠন কেবল নতুন ভবন নির্মাণের বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তব সমাধান নয়, বরং নতুন সংকটের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।