'কষ্ট' এক শব্দে ফাইনাল হারের প্রতিক্রিয়া আর্তেতার

বলটি পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে চলে যাওয়ার পরপরই গ্যাব্রিয়েল মাগালেস আকাশের দিকে তাকালেন, দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন এবং ঘামে ভেজা আর্সেনালের জার্সিটি টেনে মাথার ওপর তুলে নিলেন। ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই বুকভাঙা কান্নার মুহূর্তে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন পিএসজি অধিনায়ক ও তাঁর ব্রাজিলিয়ান জাতীয় দলের সতীর্থ মার্কিনহোস—যিনি একটু পরেই প্যারিস সেন্ট জার্মেইর হয়ে ইউরোপ সেরার ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরবেন।

টাইব্রেকারের এই একটি পেনাল্টি মিসের মাধ্যমেই আর্সেনালের ১৪০ বছরের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি মৌসুম শেষ হলো চরম নির্মম আর বেদনাদায়ক উপায়ে। টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল থেকে বিদায় নিল গানার্সরা। আর সেই ভাগ্যনির্ধারক শটটি মিস করে খলনায়ক বনে গেলেন পুরো মৌসুমে দলের রক্ষণের মূল ভরসা হয়ে থাকা গ্যাব্রিয়েল।

ম্যাচ শেষে আর্সেনালের ইংলিশ মিডফিল্ডার ডিক্লান রাইস অত্যন্ত হতাশ হয়ে বলেন, 'এমনটা ঘটেই, এটাই ফুটবল। আর এটি ভীষণ নির্মম।'

ট্র্যাজেডির নায়ক গ্যাব্রিয়েল: রক্ষণের দেয়াল যখন ভাগ্যাহত

আর্সেনাল শিবিরের কোনো ফুটবলারের যদি এই ফাইনালের ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া না লাগত, তবে সেই তালিকায় সবার আগে নাম আসত গ্যাব্রিয়েলের। কারণ, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে আর্তেতার রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ ছিলেন তিনি। ফাইনালে নামার আগে খেলা ১৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে তাঁর রক্ষণভাগ গোল হজম করেছিল মাত্র ৬টি।

শুধু তাই নয়, দীর্ঘ ২২ বছর পর আর্সেনালের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জয়ের ঐতিহাসিক যাত্রায় ৩৮টি ম্যাচের অর্ধেক ম্যাচেই (১৯টি) জাল অক্ষত (ক্লিন শিট) রেখেছিলেন গ্যাব্রিয়েলরা। বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় শনিবার রাতে ইউরোপের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণভাগের একের পর এক ঢেউয়ের মতো আক্রমণ রুখে দিয়েছিল এই ডিফেন্ডারই।

তাঁর প্রশংসায় ডেক্লান রাইস আরও বলেন, 'গ্যাব্রিয়েলকে একজন মানুষ এবং একজন খেলোয়াড় হিসেবে বর্ণনা করার মতো শব্দ আমার জানা নেই।'

দলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই টাইব্রেকারে আর্সেনালের পঞ্চম শটটি নেওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান। কারণ, এর আগে এবারিচি এজে শট মিস করায় আর্সেনালকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখার জন্য পঞ্চম শটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গ্যাব্রিয়েল একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস নিলেন, কিছুটা শ্লথ গতিতে দৌড়ে এসে শট নিলেন, কিন্তু বল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে গেল। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও আর্সেনালের ডায়েরিতে যুক্ত হলো আরেকটি 'কাছে গিয়েও ট্রফি না পাওয়ার' গল্প।

আর্তেতার মনে দুই অনুভূতি: ‘কষ্ট’ ও ‘গর্ব’

হৃদয়বিদারক এই হারের পর আর্সেনাল ম্যানেজার মিকেল আর্তেতাকে তাঁর অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে কেবল একটি শব্দই ব্যবহার করেন: “কষ্ট”। তবে এর পরপরই তিনি আরেকটি শব্দ যোগ করেন: “গর্ব”।

আর্তেতা বলেন, "আমি আমার খেলোয়াড় এবং স্টাফদের বলেছি, আমি যদি এক মিলিয়ন বারও তাদের ‘ধন্যবাদ’ জানাই, তবুও তা যথেষ্ট হবে না।"

গানার্সরা নিজেদেরকে আবারও ইংল্যান্ডের সেরা দল হিসেবে প্রমাণ করেছে। তারা ইউরোপের সেরা হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। আর্তেতা তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, "তোমাদের এই কষ্টটা সহ্য করতে হবে, এটি হজম করতে হবে এবং একে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার জ্বালানি হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। নিজেদের আরও উন্নত করে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে, কারণ ইউরোপের ফুটবলের যে মান, তাতে টিকে থাকতে হলে আমাদের আরও উঁচু স্তরের পারফর্ম করতে হবে।"

ভবিষ্যতে আর্সেনালের রণকৌশল বদলের ইঙ্গিত

আর্তেতার অধীনে আর্সেনালের খেলার ধরন কিছুটা বাস্তবমুখী বা রক্ষণাত্মক—এমন সমালোচনা অনেকের মুখেই শোনা যায়। তবে এই হারের পর আর্তেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দল এবার ভিন্নভাবে নিজেদের তৈরি করতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, 'প্রথমত আমি কয়েকটা দিন আমার পরিবারের সাথে কাটাব। এরপর আমরা এই মৌসুমে কী করেছি তা পর্যালোচনা করার প্রক্রিয়া শুরু করব। আমরা যদি আরও বড় গন্তব্যে পৌঁছাতে চাই, তবে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাতে হবে, কারণ এই দলের সেই সামর্থ্য রয়েছে। তবে তার জন্য আপনাকে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে হবে এবং খুব দ্রুত ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে।'