কেন কোরবানি দেওয়া হয়নি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে?

ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিক্রি হওয়া অ্যালবিনো জাতের আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে কোরবানি দেওয়া হয়নি। ঈদের আগের দিন বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টায় কেরানীগঞ্জের জিনজিরার ইসলামপুর থেকে মহিষটিকে কেরানীগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওই দিন রাতেই জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। যদিও মহিষটির ক্রেতাকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেয় থানা পুলিশ। মহিষটি কোরবানির উদ্দেশে বিক্রি হলেও সেটিকে দেখতে মানুষের উপচেপড়া ভিড় এবং বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় সরকার এটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়।

সূত্র জানায়, মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য ঈদের আগের দিন বিকেলে মহিষটি নিয়ে যায় পুলিশ। বিশ্বব্যাপী আলোচিত এ মহিষকে মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ হস্তক্ষেপে মহিষটিকে কোরবানি না দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।

দর্শনার্থীদের ভিড় : চিড়িয়াখানায় নেওয়ার পরদিন অর্থাৎ ঈদের দিন থেকেই মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে দেখতে ভিড় করতে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের। সরেজমিন দেখা যায়, ঈদের দিন যারাই চিড়িয়াখানায় এসেছেন, একবারের জন্য হলেও ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে দেখতে ‘এল-০৭’ খাঁচার সামনে আসছেন। ফলে চিড়িয়াখানার অন্যান্য খাঁচার সামনে দর্শনার্থী কম থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে ভিড় লেগেই ছিল। কেউ ছবি তুলেছেন আবার কেউ দূর থেকে সেলফি তুলছেন, কেউ দুষ্টুমি করছেন। এখন চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে মহিষটি। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, মহিষটি প্রদর্শনের জন্য নিয়ে আসা না হলেও নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে দর্শনার্থীরা অবশ্যই দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

কোরবানি না হওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক বলেন, “এ মহিষটি নিয়ে মানুষের মনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া এটি একটি ‘রেয়ার ব্রিড’ হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আপাতত পশুটি কিনে নিয়েছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রাণীটির যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার বিষয়টি দেখভালের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।”

নামের বানান ভুলে বরখাস্ত চিড়িয়াখানার কিউরেটর : এদিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় রাখা মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-এর নাম প্রদর্শন এবং পরে সেই নামের বানান ভুল লেখার ঘটনায় জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সরকার। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত শনিবার বিকেলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিসিএস (পশুপালন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে প্রজ্ঞাপনে অভিযোগের প্রকৃতি উল্লেখ করা হয়নি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনের জন্য তৈরি করা তথ্যফলকে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’র পরিবর্তে ‘ডোনাল্ড ট্টাম্প’ লেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে একটি মহিষের নাম সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শন এবং পরে সেই নামও ভুলভাবে লেখা গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি। বিষয়টি উচ্চপর্যায় পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই চিড়িয়াখানার কিউরেটরের বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

লালগালিচায় সংবর্ধনা : বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হওয়া অ্যালবিনো মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লালগালিচায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার বিকেলে ক্রেতা মহিষটি নিতে এলে রাজকীয় বিদায় দেয় রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম কর্তৃপক্ষ। এরপর মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঢাকায় নিয়ে যান ক্রেতা। এদিন দুপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ায় খামারিরা মহিষটিকে গোসল দিয়ে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নেয়। পরে মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজকীয় পোশাক পরিয়ে, রঙিন ধোঁয়া উড়িয়ে, লালগালিচায় হাটিয়ে বিদায় জানানো হয়। এ সময় ফার্মের মালিকপক্ষ ও উপস্থিত লোকজন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অপরদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজেদের এলাকায় নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ক্রেতা ও তার বন্ধু-স্বজনরা।

অ্যালবিনো জাতের মহিষটির চুল ও চোখ দেখতে অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো। এ কারণে ফার্মের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ছোট ভাই আদর করে মহিষটির নাম রাখেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় এক মাস আগে কোরবানির জন্য ৭০০ কেজি ওজনের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তিন লাখ ৮৫ হাজার টাকায় কিনেছিলেন রাজধানীর জিনজিরা এলাকার ক্রেতা সামির। এরপর মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখতে উৎসুক জনতা ভিড় করেন। বরিশাল, কুমিল্লাসহ দূরবর্তী জেলা থেকেও লোকজন আসেন।

মহিষটির বিশেষ এই রঙের কারণ ব্যাখ্যা করে জাতীয় চিড়িয়াখানার বরখাস্ত হওয়া কিউরেটর ডা. আতিকুর রহমান বলেন, ইন ব্রিডিং (একই বংশের মধ্যে প্রজনন) হলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চিড়িয়াখানায় চারটি বাঘের মধ্যে তিনটি বাচ্চা বাঘ এমন সাদা হয়েছে। শরীরে রঞ্জক পদার্থ ম্যালানিন কম থাকলে মহিষের ক্ষেত্রে কালো না হয়ে সাদা হবে। প্রতি ১০ হাজারের মধ্যে একটি এমন হতে পারে।

রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের এক কর্মচারী জানান, মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিদায় জানাতে কষ্ট লাগছে। আমরা কখনো মহিষটিকে ভুলব না। এক দর্শনার্থী জানান, ভাইরাল মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্প এতদিন নারায়ণগঞ্জে ছিল। এটা তাদের কাছে অনেক আনন্দের ছিল। রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী জিয়াউদ্দিন মৃধা জানান, মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিদায় জানাতে কষ্ট লাগলেও কোরবানি ত্যাগের মহিমায় দিতে হয়। আমরা আজীবন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মনে রাখব। মহিষটিকে নিতে আসা ক্রেতা সামির জানান, মহিষটি অনেকদিন আগে ক্রয় করেছি। হঠাৎ ভাইরাল হওয়ার খবর পাই। মহিষটিকে দেখার জন্য আমাদের এলাকার লোকজনও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।