রাজধানীর কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে সফল হতে পারেনি দুই সিটি করপোরেশন। নানা অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত শুক্রবার বিকেলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে অব্যবস্থাপনার কারণে দুজন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি-১ জাহিদুল ইসলাম রনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিন রোড, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় কোরবানির পশুর বর্জ্যরে পাশাপাশি আগের জমে থাকা ময়লা সড়কে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জোন ৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান (উপসচিব) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জোন ১-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির (উপসচিব)।
আরও ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশনে অবহেলার অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আরও ছয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দায়িত্বে ব্যর্থতার কারণে তাদের প্রত্যাহার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই ছয় কর্মকর্তা হলেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
গত শুক্রবার কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বর্জ্য অপসারণে ধীরগতি ও সড়কে ময়লা পড়ে থাকার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশনের স্থান পরিষ্কার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে এ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা দ্রুত কার্যকর করা হবে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানিয়েছেন, রাজধানীর কোরবানির বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়া ভালোভাবে হচ্ছে কি না তা দেখতেই বেরিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসা থেকে বেরিয়ে গুলশান-১ নম্বর মোড় হয়ে হাতিরঝিল, রামপুরা রোড, মালিবাগের আবুল হোটেল দিয়ে তালতলা মার্কেট হয়ে বাসাবোর দিকে যায়। এরপর কমলাপুর স্টেডিয়াম, সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড, যাত্রাবাড়ী মোড়, ধোলাই খাল হয়ে শহীদ ফারুক সড়ক, দয়াগঞ্জ সড়ক দিয়ে নারিন্দা হয়ে রায়সাহেব বাজার মোড় দিয়ে আদালত পাড়ায় যান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে নয়াবাজার, বংশাল রোড হয়ে গুলিস্তান, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে তিনি নিউমার্কেট যান। এরপর সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে ডান দিকে কলাবাগান, মিরপুর রোড, সিটি কলেজের সামনে দিয়ে সীমান্ত স্কয়ার হয়ে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড দিয়ে ধানম-ি সাত মসজিদ রোড, ২৭ নম্বর সড়ক দিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে পান্থপথ, ফার্মগেট, বিজয় সরণি হয়ে মহাখালী সড়কের পরিস্থিতিও প্রধানমন্ত্রী দেখেন। পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব অ্যাড. মেহেদুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকশনের পর বদলে যায় দৃশ্যপট : গত শুক্রবার বর্জ্য অপসারণের ব্যর্থতার দায়ে দুই সিটি করপোরেশনের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে যায়। শুক্রবার যেখানে বর্জ্যরে স্তূপ ছিল, সেখানে ধুয়েমুছে সাফ করেছেন দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। বর্জ্য অপসারণসহ অনেক এলাকায় সড়ক ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দুর্গন্ধমুক্ত করা হয়। যেসব এলাকায় একদিন আগেও বর্জ্য পড়ে ছিল, সেসব স্থানেও জোর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চোখে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম আরও সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নজর দিলে কাজে গতি বাড়ে। তবে আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল। আমরা আবারও সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছি। আপাতত কোরবানির বর্জ্য তেমন একটা নেই। এরপরও কোথাও বর্জ্যরে খবর পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
হাতিরঝিল পরিষ্কার করছে রাজউক : গত শনিবার রাজধানীর হাতিরঝিল লেকের আবর্জনা পরিষ্কার শুরু করেছে রাজউক। এদিন সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরেজমিন দেখে অসন্তোষ প্রকাশের পর হাতিরঝিল লেকের আবর্জনা পরিষ্কার শুরু করে সংস্থাটি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি দেখার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদের সময় মানুষ লেকের পাড়ে বেশি আবর্জনা ফেলে। আমরা প্রতিবারই এভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করি। এ অভিযান চলমান থাকবে।
অলিগলিতে বর্জ্য অপসারণে ধীরগতি : ডিএসসিসি ৮ ঘণ্টায় এবং ডিএনসিসি ১২ ঘণ্টায় কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা শতভাগ বর্জ্য অপসারণ করতে পারেনি। ঈদের পরদিনও নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও ড্রেনে বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর, রামপুরা, মালিবাগ, শান্তিনগর, মগবাজার, ধানম-ি, হাজারীবাগ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে কোরবানির বর্জ্য দেখা গেছে। কোথাও ড্রেনের মুখ আটকে আছে বর্জ্য,ে কোথাও আবার জমে থাকা রক্ত ও ময়লা পানিতে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। অনেক এলাকায় নির্ধারিত ডাম্পিং পয়েন্টে বর্জ্য নেওয়া হলেও সেগুলো দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে আশপাশে।
উত্তরার বাসিন্দা আজহারুল ইসলাম সুজন বলেন, প্রতি বছরই ঈদের পর মানুষ ঘুরতে দিয়াবাড়ি আসে। সুন্দর পরিবেশের জন্য আমরাও যাই। কিন্তু এবার এ এলাকাকে বর্জ্যরে ভাগাড় বানানো হয়েছে। রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, এমনকি মেট্রো স্টেশনের আশপাশে বর্জ্য। চামড়া ও বর্জ্য একসঙ্গে জমে থাকায় দুর্গন্ধ আরও তীব্র হয়েছে।
কালশী এলাকার বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, চারদিকে দুর্গন্ধ, সঙ্গে মাছি আর কুকুরের ভিড়। শিশুদের নিয়ে বাসায় থাকা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। মিরপুর ১-এর বাসিন্দা শিউলি আক্তার বলেন, ড্রেনের মুখে পশুর নাড়িভুঁড়ি আটকে আছে। দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে একটু বাইরে ঘুরব, সেটারও সুযোগ পাচ্ছি না। আবার দুর্গন্ধে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হওয়ায় পুরো শহর পরিষ্কার করতে গিয়ে কিছুটা সময় লাগছে। অনেক এলাকায় নতুন করে কোরবানি হওয়ায় আবারও বর্জ্য জমছে বলেও জানানো হয়েছে।
রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে অপসারণ করতে না পারায় ট্রাকের সংকটকে দায়ী করেছেন ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি বলেছেন, পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে শহরের সব বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে সরানো সম্ভব হয়নি।
ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান অবশ্য ঈদুল আজহার তৃতীয় দিন শেষে তার এলাকায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় গুলশান ২-এ ডিএনসিসির নগর ভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
এদিকে কোরবানির ১১টি অস্থায়ী হাটের বর্জ্য অপসারণে শর্ত অনুযায়ী, ইজারাদাররা নির্ধারিত সময়ে কাজ না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডিএসসিসি প্রশাসক। গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এর প্রেক্ষিতে শর্তভঙ্গকারী ইজারাদারদের জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। টানা তিন দিন কোরবানি, যত্রতত্র চামড়া ফেলে রাখা ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে যাওয়ার পথে যাত্রাবাড়ী অংশের যানজটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।