বিশ্ব দুগ্ধ দিবস

পুষ্টি, অর্থনীতি ও নারী খামারির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের দুগ্ধখাত

একটি উন্নত, দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো নিরাপদ খাদ্য ও পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং সুস্থ মানবসম্পদ গঠনে প্রাণিজ আমিষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রাণিজ খাদ্যের মধ্যে দুধকে ধরা হয় সবচেয়ে পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও সহজলভ্য খাদ্যগুলোর একটি। এ কারণেই দুধ কেবল একটি খাদ্য নয়, বরং পুষ্টি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি খাত।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ প্রাণিসম্পদসমৃদ্ধ দেশ। এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশে মোট গৃহপালিত প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ৪৬৪.৬৩ মিলিয়ন। অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে ৩ হাজারেরও বেশি গবাদি ও গৃহপালিত প্রাণী লালন-পালন করা হয়, যেখানে বিশ্ব গড় প্রায় ২৯টি। সীমিত ভূমি ও বিপুল জনসংখ্যার দেশে এই প্রাণিসম্পদ একদিকে যেমন ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, অন্যদিকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করেছে।

সরকার “সকলের জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিতকরণ” ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে গরুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ, মহিষ ১৫ লাখের বেশি, ছাগল প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখ, ভেড়া প্রায় ৪০ লাখ, মুরগি প্রায় ৩৩৬ কোটি এবং হাঁস ৭০ কোটিরও বেশি। এই বিশাল প্রাণিসম্পদ দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬৯-৭০ সালে দেশে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ২৭ লাখ টন, ১ দশমিক ২৭ লাখ টন এবং ৩৫ দশমিক ৩ কোটি। বিপরীতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ মেট্রিক টনে, মাংস ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ মেট্রিক টনে এবং ডিম উৎপাদন ২,৪৪০ দশমিক ৬৫ কোটিতে। বর্তমানে মাথাপিছু মাংস উৎপাদন দৈনিক ১৩৭ দশমিক ৯০ গ্রাম এবং ডিম উৎপাদন বছরে ১৩৭ দশমিক ১৯টি, যা জাতীয় চাহিদার তুলনায় বেশি। দুধ উৎপাদনও মাথাপিছু ২৩৯ দশমিক ২৯ মিলিলিটারে পৌঁছেছে, যা কাঙ্ক্ষিত ২৫০ মিলিলিটারের খুব কাছাকাছি। অর্থাৎ বাংলাদেশ দুধ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।

বিশ্বব্যাপী দুধের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ১ জুন পালিত হয় বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০০১ সাল থেকে দিবসটি পালন করে আসছে। এ বছরের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য "সেলিব্রেটিং উইমেন ফার্মার্স", যার আলোকে বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- “দুগ্ধ উৎপাদনে নারী খামারি, উন্নয়নের অগ্রযাত্রা”। এ প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ নারী খামারিদের অবদানকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের দুগ্ধখাতে নারীদের অবদান দিন দিন দৃশ্যমান হচ্ছে। গ্রামের অসংখ্য নারী গাভী পালন, দুধ সংগ্রহ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বাছুর পরিচর্যা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে খামার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেক পরিবারে নারীদের আয় পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এবং শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি ব্যয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ফলে দুগ্ধখাত কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, নারী ক্ষমতায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

তবে অগ্রগতির পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশে দুধের চাহিদা প্রায় ১৫.৮৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন হলেও সরবরাহ প্রায় ১৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন। মাথাপিছু দুধ গ্রহণ বর্তমানে প্রায় ১২০ মিলিলিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ২৫০ মিলিলিটারের তুলনায় কম। চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে খামারিরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন, আবার ভোক্তারা উচ্চমূল্যের কথা বলেন। খাঁটি দুধের অভাব, পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য, রোগব্যাধি, সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সংকরায়নের মাধ্যমে উন্নত জাতের গবাদিপশু সম্প্রসারণ, সবুজ ঘাস চাষ, রোগ প্রতিরোধ, প্রযুক্তিনির্ভর খামার ব্যবস্থাপনা এবং ডেইরি হাব ও গ্রামীণ দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) উচ্চ ফলনশীল ঘাস, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় জাত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করছে।

বিএলআরআইয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, নেপিয়ার ঘাসভিত্তিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে দুধ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। প্রায় ১ কেজি নেপিয়ার ড্রাই ম্যাটার খাইয়ে ১ কেজি দুধ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম। গবেষণার ফলাফল বলছে, দেশীয় জাতের গরু ও মহিষের উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের মাধ্যমে খামারির আয় বাডানো এবং দেশের দুধ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

দেশীয় জাত উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশের প্রথম দেশীয় স্বীকৃত গরুর জাত রেড চিটাগাং ক্যাটেল (আরসিসি)-এর গড় দুধ উৎপাদন প্রতিদিন ২.৫ লিটার থেকে ৪.৫ লিটারে উন্নীত হয়েছে। বিসিবি-১ (পাবনা) জাতের গরুর ক্ষেত্রেও দুধ উৎপাদন বেড়েছে। দেশি মহিষের দৈনিক দুধ উৎপাদন ২-৩ লিটার থেকে ৪-৫ লিটারে উন্নীত করার ক্ষেত্রে গবেষণা কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। উন্নত প্রজনন প্রযুক্তি ও ফ্রোজেন সিমেন ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগও চলমান রয়েছে।

পুষ্টিগুণের বিচারে দুধ এক অনন্য খাদ্য। গরুর পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুধে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ভিটামিন এ, ডি ও বি-১২-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। হাড় ও দাঁত মজবুত করা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ ঘুম নিশ্চিত করতেও দুধ সহায়ক ভূমিকা রাখে। শিশু, কিশোর, গর্ভবতী নারী এবং প্রবীণদের জন্য দুধ বিশেষভাবে উপকারী।

বাংলাদেশে দুগ্ধখাত শুধু পুষ্টির নয়, অর্থনীতিরও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। লক্ষ লক্ষ মানুষ গবাদিপশু পালন, দুধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং নারী খামারিদের স্বাবলম্বী করতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একইসঙ্গে দুধভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।

বিশ্ব দুগ্ধ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দুধ শুধু একটি পানীয় নয়; এটি পুষ্টি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, নারী খামারিদের ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তি ও গবেষণার সম্প্রসারণ এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের দুগ্ধখাত আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সম্মিলিত উদ্যোগ ও কার্যকর সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে অচিরেই দেশ দুধ উৎপাদনে পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য অর্জন করবে- এমন প্রত্যাশা এখন সময়ের দাবি। সরকারও এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়