আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ

নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি আমাদের জন্য উত্তম নমুনা। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনসহ সর্বত্র আছে তার সঠিক দিকনির্দেশনা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন সফল পুরুষ, রাষ্ট্রীয় জীবনে তিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে তিনি একজন সফল শিক্ষক। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়েও জ্ঞান বিলাতে তিনি ইতস্তত করেননি। তার পুরো জীবনই আমাদের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। তার জীবনের বিশেষ কয়েকটি দিক নিয়ে বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরা হলো।

রাসুল (সা.) ছিলেন অত্যন্ত কোমল ও নরম প্রকৃতির মানুষ। তিনি সবার সঙ্গে কোমল ও নম্র ব্যবহার করতেন। কারও ওপর অযথা রাগান্বিত হতেন না। জুলুম-অবিচার করার প্রশ্নই ওঠে না। ন্যায়-নীতি ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় পৃথিবীতে তার মতো কেউ নেই। তিনি ইনসাফপূর্ণ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই সেখানে বসবাস করেছিল। সর্বত্র সুশাসন বিরাজমান ছিল। তার বিচারকার্যে কোনো স্বজনপ্রীতি ছিল না। অপরাধী সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী পরিবারের হলেও তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। মাখজুমি গোত্রের জনৈক মহিলার ঘটনা তার উত্তম দৃষ্টান্ত। চুরিতে ধৃত হওয়ার পর উসামা (রা.)-এর সুপারিশও আমলে নেওয়া হয়নি। উল্টো উসামা (সা.)-এর প্রতি রাসুল (সা.) ভীষণ ক্ষুব্ধ হন।

রাসুল (সা.) রাগ-ক্ষোভ সংবরণ করতেন। সবার প্রতি সদয় ও কোমল থাকতেন। কিন্তু আল্লাহর বিধিনিষেধ কেউ লঙ্ঘন করলে ছাড় দিতেন না। এতে দলপ্রীতি বা গোত্রপ্রীতির কোনো সুযোগ ছিল না। তবে ব্যক্তিগত কারণে কারও প্রতি তিনি রাগান্বিত হতেন না। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, একদা আমি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে হাঁটছি। হঠাৎ এক বেদুইন ব্যক্তি দৌড়ে এসে পেছন থেকে নবীজির চাদর শক্তভাবে টান দেয়। এতে নবীজির শরীরে কিছুটা আচড় লাগে। অতঃপর বেদুইন ব্যক্তি বলল, আপনার কাছে আল্লাহতায়ালার যে সম্পদ রয়েছে তা থেকে আমাকে দিতে আদেশ করুন। নবীজি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেন এবং তাকে কিছু দান করার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি)

তার ক্রোধ সংবরণ, দয়া ও সহনশীলতার অন্যতম আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যায়েদ ইবনে সানাহ (রা.)-এর ঘটনা থেকে। একদা যায়েদ ইবনে সানাহ নবীজির দরবারে এসে তার পাওনা ঋণ তলব করে। নবীজির কাপড় টান দিয়ে কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলে। মারাত্মক রূঢ় আচরণ করার বলে, বনি আবদুল মুত্তালিব তো দেখছি ঋণ নিয়ে টালবাহানা করে। ঘটনাস্থলে ওমর (রা.) উপস্থিত ছিলেন। ওমর (রা.) এসব দেখে রাগে-ক্রোধে জ্বলে ওঠেন। হজরত রাসুল (সা.) ওমর (রা.)-কে থামিয়ে বলেন, ‘ওমর! আমি এবং সে তোমার কাছে এর চেয়ে ভালো কিছুর আশায় ছিলাম। তুমি আমাকে বলতে পারতে সুন্দরভাবে তার পাওনা পরিশোধ করে দিতে আর তাকে বলতে পারতে সুন্দরভাবে পাওনা তলব করতে।’ এদিকে পাওনা বা ঋণের মেয়াদ তখনও তিন দিন বাকি ছিল, তবুও রাসুল (সা.) ওমর (রা.)-কে তার পাওনা বা ঋণ পরিশোধ করতে নির্দেশ দিলেন এবং অতিরিক্ত ২০ সা’ (প্রায় ৬০ কেজি) খেজুর দেওয়ার কথাও বললেন। ওই ঘটনায় অভিভূত হয়ে পরবর্তী সময় যায়েদ ইবনে সানাহ ইসলাম গ্রহণ করেন। (মুসতাদরাকে হাকিম)

উম্মতের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা নবীজির চরিত্রের অন্যতম নিদর্শন। তিনি উম্মতের দরদে তায়েফ গেলেন। দরদ মাখা কণ্ঠে আহ্বান করলেন চিরমুক্তির পথে। কিন্তু উদ্ধত তায়েফবাসী তার প্রতি তেড়ে এসে লেলিয়ে দিল খারাপ যুবকদের। তারা তাকে ইটপাটকেল ছুড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল। হতাশ ও ব্যথিত হৃদয়ে ফিরছেন তিনি। পথে নেমে এলেন ফেরশতা। তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা জানালেন। কিন্তু না, তিনি তাদের ধ্বংস চাননি। তিনি তার রাগ ও ক্রোধ সংবরণ করেছেন। তাদের অজ্ঞতাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং হেদায়েতের দোয়া করেছেন। একবার আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন কোনো দিন কী আপনার জীবনে আছে? জবাবে তিনি বলেছিলেন, তায়েফের দিন ছিল আমার কাছে উহুদের চেয়েও বেশি কঠিন ও বেদনাদায়ক। (সহিহ বুখারি)

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক