গোয়ায় বিপর্যস্ত এক বাংলাদেশ!

তরুণদের সুযোগ দিতে সিনিয়রদের বেঞ্চে বসানো হয়েছে। বাংলার মেসি খ্যাত ঋতুপর্ণার পায়ে নেই কোনো গোল। দিকবিদিক শট করে গোলের সুযোগ হাতছাড়া করা। একজনের সাফল্যে অন্যজন ঈর্ষান্বিত হওয়া। দীর্ঘ ৭ বছর পর ভারতের কাছে হার। চার গোলের বিপরীতে পাঁচ গোল হজম। অন্যদিকে দলের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ। সব মিলিয়ে ভারতের গোয়ায় যেন বিপর্যন্ত এক বাংলাদেশকেই দেখছেন ভক্তরা। ফলে সাফ নারী ফুটবলে হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় এসে পড়েছে বাংলাদেশ।

গোয়ার সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স এখন উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালদ্বীপের বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয় দিয়ে শুরু হলেও সেই ম্যাচে দলের খেলায় ছিল না কোনো ছন্দ, ছিল না প্রত্যাশিত আধিপত্য। আর ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলের পরাজয় বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। কোচ পিটার বাটলারের অধীনে খেলতে নেমে যেন নিজেদের চেনা রূপ হারিয়ে ফেলেছেন মারিয়া মান্দা, আফঈদা খন্দকার, ঋতুপর্ণা চাকমাসহ জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ফুটবলাররা।

মালদ্বীপের বিপক্ষে জয় এলেও মাঠের খেলায় বাংলাদেশের আধিপত্য ছিল না। রক্ষণভাগে বারবার ভুল, মাঝমাঠে সমন্বয়ের অভাব এবং আক্রমণভাগে অগোছালো ফুটবল চোখে পড়েছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা নিজেদের নির্ধারিত অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে সহজেই সুযোগ তৈরি করেছে মালদ্বীপ। চার গোল করেও দুই গোল হজম করা বাংলাদেশ দলের রক্ষণভাগের দুর্বলতারই প্রমাণ।

ভারতের বিপক্ষে সেই দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। ফরোয়ার্ডদের পায়ে ছিল না প্রয়োজনীয় গতি ও ধার। আক্রমণে ওঠার সময় সমন্বয়হীনতা এবং বল নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ভারতের রক্ষণকে খুব একটা চাপে ফেলতে পারেনি। ফলে পুরো ম্যাচে কার্যকর আক্রমণের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা।

কোচিং সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নিয়মিত মিডফিল্ডে বা অন্য পজিশনে খেলা আনিকা রানীকে ফরোয়ার্ডে খেলানোর সিদ্ধান্ত কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি। আক্রমণভাগে তার উপস্থিতি দলের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করেছে বলে মনে করছেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ঋতুপর্ণা চাকমার নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করাও বাংলাদেশের হতাশার তালিকাকে আরও দীর্ঘ করেছে। যে ঋতুপর্ণা অতীতে বড় ম্যাচে দলের ভরসা ছিলেন, তিনিও এবার নিজের সেরা ছন্দে নেই।

মাঝমাঠেও দেখা গেছে সৃজনশীলতার সংকট। অধিনায়ক মারিয়া মান্দা ও আফঈদাদের কাছ থেকে যে নেতৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি। প্রতিপক্ষের চাপে বলের দখল ধরে রাখা এবং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দল বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিয়েছে প্রতিপক্ষ। দল পুনর্গঠন ও সিনিয়র খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে কোচ বলেন, ‘আমি আসলে দলটাকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করছি; কারণ, আমি জানি কিছু খেলোয়াড় তাদের ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি খেলোয়াড়দের আগুনের মুখ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কারণ, আমি জানি আসলে কী ঘটছে।’

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান ফুটবলারদের হাত ধরে দেশের নারী ফুটবল নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মাঠের পারফরম্যান্সে যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও দলগত সমন্বয়েও দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের সংকট। বিষয়টি স্বীকার করলেন স্বয়ং কোচও। ভারতের কাছে হারের পর হতাশ পিটার বলেন, ‘আপনি যদি একজন ভারতীয় খেলোয়াড়কে ওয়ার্ম-আপ করতে বলেন, সে দৌড়ে যাবে। কারণ, সে মাঠে নামার জন্য উদগ্রীব; কিন্তু আমাদের কিছু খেলোয়াড়কে বললে তারা হেঁটে হেঁটে যায়, সময়মতো ওয়ার্ম-আপ এলাকায় যায় না।’

সাফের বাকি ম্যাচগুলো সামনে রেখে এখন রুত ঘুরে দাঁড়ানোই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোচিং কৌশল, খেলোয়াড় নির্বাচন এবং মাঠের পারফরম্যান্স সবকিছুতেই প্রয়োজন তাৎক্ষণিক উন্নতি। অন্যথায় শিরোপার স্বপ্ন তো দূরের কথা, প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থান ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের জন্য।