আজ বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস

আধুনিক নগর পরিকল্পনা: প্যাডেলের ছন্দে টেকসই ভবিষ্যত

পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই নগর জীবন গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতি বছরই ৩ জুন বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় ‌‘বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস’ ((World Bicycle Day)। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকেই দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান এবং সহজ মাধ্যম হিসেবে বাইসাইকেল তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি এবং আধুনিক ও বিলাসবহুল যানবাহনের মেলার এই যুগে, একটি অতি সাধারণ দুই চাকার যান হিসেবে বাইসাইকেলের গুরুত্ব কখনও হ্রাস পায়নি, বরং জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের এই সংকটময় মুহূর্তে এর প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব বাইসাইকেল দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বা থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Cycling for a Greener Future’ বা ‘সবুজ ভবিষ্যতের জন্য সাইকেল চালনা’। এই প্রতিপাদ্যটি বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকট মোকাবেলা এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাইসাইকেলের অবিচ্ছেদ্য ভূমিকাকেই আমাদের সামনে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস ঘোষণার ইতিহাস খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও পরিবেশগত উদ্দেশ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক লেশেক সিবিলস্কি এবং তার শিক্ষার্থীরা মিলে বিশ্বব্যাপী বাইসাইকেলকে একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তারা চেয়েছিলেন এমন একটি নির্দিষ্ট দিন থাকুক, যা মানুষের এই সাধারণ অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী বাহনটির গুণাবলী বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। সিবিলস্কির অক্লান্ত পরিশ্রম এবং লবিংয়ের ফলশ্রুতিতে, ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র সর্বসম্মতিক্রমে ৩ জুনকে ‘বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব পাস করে। এই ঐতিহাসিক রেজোলিউশনে বাইসাইকেলের স্থায়িত্ব, বহুমুখিতা এবং এটি যে দুই শতক ধরে অত্যন্ত সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সে বিষয়টিকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জাতিসংঘ বাইসাইকেলকে কেবল একটি সাধারণ যান হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছে।

পরিবেশগত দিক থেকে বাইসাইকেল হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্কলুষ বাহন। এটি চালাতে কোনো পেট্রোল, ডিজেল বা গ্যাসের প্রয়োজন হয় না, যার ফলে এটি থেকে কোনো ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস বা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয় না। একটি মোটরচালিত গাড়ি প্রতি কিলোমিটার চলার জন্য যে পরিমাণ কার্বন বাতাসে ছাড়ে, একটি সাইকেল তার বিপরীতে শূন্য কার্বন নিঃসরণ নিশ্চিত করে। শহরের ভেতরের ছোট ছোট দূরত্বের যাতায়াতের জন্য যদি মানুষ গাড়ির পরিবর্তে সাইকেল ব্যবহার শুরু করে, তবে বায়ুমন্ডলে কার্বনের মাত্রা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, সাইকেল কোনো শব্দদূষণ সৃষ্টি করে না, ফলে এটি শহরের মানসিক শান্তি এবং বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের জীবন এখন অনেক বেশি গতিশীল এবং একই সঙ্গে আরামপ্রিয় ও অলস (sedentary) হয়ে পড়েছে। এর ফলে স্থূলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো জীবনযাত্রাজনিত রোগব্যাধি বিশ্বজুড়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে। নিয়মিত সাইকেল চালানো এই সমস্যাগুলোর সবচেয়ে সহজ ও আনন্দদায়ক সমাধান। সাইকেল চালানো একটি চমৎকার ‘অ্যারোবিক ব্যায়াম’, যা হৃদপিন্ডের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে। এটি পায়ের পেশী শক্তিশালী করে এবং শরীরের অতিরিক্ত ক্যালোরি পুড়িয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত সাইকেল চালান, তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যায়। শারীরিক উপকারের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও সাইকেলের ইতিবাচক প্রভাব অপরিসীম। মুক্ত বাতাসে সাইকেল চালালে মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ ও ‘সেরোটোনিন’ নামক হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে, যা মানুষের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ দূর করে মনকে প্রফুল্ল রাখে। প্রতিদিনের ব্যস্ত ও একঘেয়ে জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে দু'টি চাকার ওপর ভর করে প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ানো মানসিক ক্লান্তি দূর করার এক মহৌষধ।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাইসাইকেল সাধারণ মানুষের জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দিতে পারে। সাইকেল কেনার খরচ যেমন একটি মোটরগাড়ির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য, তেমনি এর রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতের খরচও সামান্য। সবচেয়ে বড় কথা, সাইকেলের জন্য কোনো জ্বালানি কিনতে হয় না। ফলে একজন ব্যক্তি যদি তার কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য সাইকেল ব্যবহার করেন, তবে প্রতি মাসে তার যাতায়াত খরচের একটি বড় অংশ সাশ্রয় হয়। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সাইকেল অত্যন্ত বৈষম্যহীন একটি বাহন। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ কিংবা বয়স নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এটি ব্যবহার করতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাইকেল অর্থনৈতিক মুক্তির এক অনন্য মাধ্যম। শিক্ষার্থীরা সহজে স্কুলে যেতে পারে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিয়ে যেতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা দুর্গম এলাকায় গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে পারেন। 

বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো তীব্র যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় জ্যামে আটকে থেকে মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি। একটি প্রাইভেট কার রাস্তায় যে পরিমাণ জায়গা দখল করে, সেই একই জায়গায় অন্তত ৫ থেকে ৬টি সাইকেল অনায়াসে চলাচল করতে পারে। শহরের অভ্যন্তরে সাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে রাস্তার ওপর গাড়ির চাপ কমবে এবং যানজট অনেকাংশে নিরসন হবে। আধুনিক নগর পরিকল্পনাবিদগণ এখন ‘১৫-মিনিট শহর’ ধারণার ওপর জোর দিচ্ছেন, যেখানে একজন নাগরিক তার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা (যেমন: কর্মক্ষেত্র, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পার্ক) মাত্র ১৫ মিনিটের হাঁটা বা সাইকেল চালানোর দূরত্বের মধ্যে পেয়ে যাবেন। তাই নগর পরিকল্পনায় সাইকেলের জন্য পৃথক ও নিরাপদ ‘সাইকেল লেন’ তৈরি করা বাধ্যতামূলক। ইউরোপের আমস্টারডাম বা কোপেনহেগেনের মতো শহরগুলো আজ বিশ্ববাসীর কাছে আদর্শ মডেল, কারণ তারা তাদের যাতায়াত ব্যবস্থার কেন্দ্রে রেখেছে বাইসাইকেলকে। 

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা SDG অর্জনে বাইসাইকেল একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এটি সরাসরি একাধিক লক্ষ্যের সাথে যুক্ত। লক্ষ্য ৩ (সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ): শারীরিক কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অসংক্রামক ব্যাধি দূর করতে সাহায্য করে। লক্ষ্য ৭ (সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি): শূন্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে এটি শতভাগ দূষণমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করে। লক্ষ্য ১১ (টেকসই নগর ও স¤প্রদায়): পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গঠনে সাইকেল লেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লক্ষ্য ১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম): কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি অবদান রাখে। তাই বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস উদযাপন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বিশ্বকে আরও সুন্দর ও টেকসই করার লক্ষ্যমাত্রার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

বিশ্বজুড়ে সাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়লেও এর প্রসারে এখনও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিরাপদ অবকাঠামোর অভাব। অধিকাংশ দেশের বিশেষ করে ঢাকা সহ এশিয়ার বড় শহরগুলোর রাস্তাঘাট কেবল দ্রুতগামী মোটরযানের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সাইকেলের জন্য আলাদা কোনো লেন না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া, পথচারী ও সাইকেল চালকদের প্রতি অন্যান্য মোটরযান চালকদের অসচেতনতা ও খামখেয়ালিপনা আরেকটি বড় সমস্যা। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হলে সরকারি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ‘সুরক্ষিত সাইকেল লেন’ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত এবং শপিং মলগুলোতে নিরাপদ সাইকেল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গণপরিবহনের (যেমন: ট্রেন বা মেট্রো) সাথে সাইকেল যাতায়াতের সমন্বয় করতে হবে, যেন দূরপাল্লার যাত্রীরাও সাইকেল সাথে নিয়ে ভ্রমণ করতে পারেন। ট্রাফিক আইনে সাইকেল চালকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর ধারা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি বাসযোগ্য এবং সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলার চাবিকাঠি আমাদের নিজেদের হাতেই রয়েছে। সাইকেলের প্যাডেলে দেওয়া প্রতিটি চাপ আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে; সাইকেল চালানোকে কেবল দরিদ্রের বাহন কিংবা শৈশবের খেলনা মনে না করে, এটিকে আধুনিক, সচেতন ও পরিবেশবান্ধব নাগরিকের জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আসুন, এই বিশ্ব বাইসাইকেল দিবসে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি, ছোট খাটো দূরত্বের যাতায়াতে আমরা গাড়ির চাবি ভুলে সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখব। আমাদের এই ছোট পরিবর্তনই একদিন পৃথিবীকে এনে দেবে এক বিশাল সবুজ ও টেকসই ভবিষ্যত।

লেখক: অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ও ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি 
যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)