শিল্পীর ক্যানভাসে থাকে রঙের সমাহার এবং আরও থাকে মানুষের গূঢ় মনস্তত্ত্ব, বিভিন্ন আবেগ এবং যাপিত জীবনের প্রতিফলন। সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার দৃশ্যমান রূপকে যখন কোনো শিল্পী নিজের ভেতরের আলো দিয়ে পুনরায় নির্মাণ করেন, তখনই জন্ম নেয় কালজয়ী শিল্পের। বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় এমনই এক নিপুণ ও স্বকীয় রূপকারের নাম মাহমুদুর রহমান দীপন। দৃশ্যমান জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক জগৎ রয়েছে, রঙ আর রেখার বুননে তাকেই পরম মমতায় মূর্ত করে তোলেন তিনি। ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পীর জীবন, দর্শন এবং শিল্পভাবনা এক দীর্ঘ ও কৌতূহলোদ্দীপক যাত্রার গল্প বলে।
মাহমুদুর রহমান দীপনের বেড়ে ওঠার গল্পটি বেশ বৈচিত্র্যময়। তার শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কেটেছে রাজধানী ঢাকার বুকে। তবে জীবনের একটি নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাকে ঢাকার বাইরের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সঙ্গেও পরিচিত হতে হয়েছে। বাবার জুট মিলের চাকরির সুবাদে তার জীবনের বেশ কয়েকটি বছর অতিবাহিত হয়েছে চট্টগ্রামের কালুরঘাট এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরব অঞ্চলে। এই স্থান পরিবর্তন তার শিল্পীসত্তায় এক বিশাল প্রভাব ফেলেছিল বলে ধারণা করা যায়। একদিকে জুট মিলের যান্ত্রিক শব্দ, শ্রমিকদের কোলাহল, কালুরঘাটের কর্ণফুলী নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি কিংবা ভৈরবের মেঘনার উত্তাল রূপ অন্যদিকে ঢাকার নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা। এই বৈপরীত্য এবং বৈচিত্র্য তার অবচেতন মনেই হয়তো রঙ ও রেখার এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করে দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তার ভেতরে ছবি আঁকার প্রতি এক দুর্বার ও অদম্য টান কাজ করত। যখন তিনি চারপাশের এই বৈচিত্র্যময় জগৎকে দেখতেন, তখন কেবল চোখ দিয়ে নয়, বরং মনের ক্যানভাসেও তিনি সেগুলো এঁকে যেতেন। শৈশবের সেই অদম্য ঝোঁক আর তীব্র ভালোবাসাই তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার দিকে ধাবিত করে। ১৯৮৫ সালে মাধ্যমিক বা এসএসসি পাসের পর তিনি নিজের স্বপ্নের জগৎ, চারুকলায় পা রাখেন। চারুকলার সেই সবুজ আঙিনাতেই তার ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এক শক্ত ও মজবুত ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেখানে তিনি শিল্পকলার ব্যাকরণ, পরিপ্রেক্ষিত এবং আলোর খেলা সম্পর্কে শেখেন।
তবে একজন প্রকৃত শিল্পী কখনোই কেবল ব্যাকরণের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারেন না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একঘেয়েমি আর প্রথাগত কাঠামোর ভেতর নিজেকে আটকে রাখা মাহমুদুর রহমান দীপনের স্বভাবে ছিল না। চারুকলায় স্নাতক পর্ব শেষে স্নাতকোত্তর পর্বে এসে তার শিল্পভাবনায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এই সময়ে তিনি তীব্রভাবে নিরীক্ষাধর্মী কাজ শুরু করেন। এতদিন ধরে শেখা শিল্পের প্রথাগত ফর্ম বা আকার ভাঙার এক অদ্ভুত ও সাহসী খেলায় মেতে ওঠেন তিনি। বাস্তবের হুবহু অনুকরণ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি বস্তুর অন্তর্নিহিত রূপ খুঁজতে শুরু করেন। এই নিরীক্ষা ও ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়েই বিমূর্ত ধারার প্রতি তার এক গভীর ও আত্মিক আকর্ষণ জন্ম নেয়।
তার এই বিমূর্ত কাজের পেছনে সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে সংগীত। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গসংগীত বা ক্লাসিক্যাল মিউজিক এবং জ্যাজ সংগীতের মূর্ছনা তার ক্যানভাসে অদ্ভুত এক জাদুর মতো কাজ করে। সংগীত এবং চিত্রকলার মধ্যকার এই অতীন্দ্রিয় সম্পর্ক তার শিল্পকর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। জ্যাজ মিউজিশিয়ানরা যেমন কোনো নির্দিষ্ট স্বরলিপিতে আবদ্ধ না থেকে গানের ভেতর দিয়ে তাৎক্ষণিক সুরের বিস্তার বা ইম্প্রোভাইজ করেন, দীপনও ঠিক একইভাবে রঙের তুলিতে ক্যানভাসে ইম্প্রোভাইজ করার চেষ্টা করেন। তিনি যখন ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ান, তখন তার তুলির আঁচড়গুলো যেন একেকটি বাদ্যযন্ত্রের নোট হয়ে ওঠে। তিনি ছবির মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ সুর তৈরি করতে চান। কখনো কখনো সেই সুর কাক্সিক্ষত ছন্দে ধরা না দিয়ে এক ধরনের তীব্র বিশৃঙ্খলা বা কেওসে পরিণত হয়। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। শিল্পীর গভীর জীবনদর্শনে, আমাদের সামগ্রিক জীবনটাই আসলে এমন এক বিশৃঙ্খলার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। মানুষের জীবনের এই অগোছালো রূপ, এই অনিয়ম এবং কোলাহলকেই তিনি অত্যন্ত সৎভাবে তার বিমূর্ত ক্যানভাসে ধারণ করেন।
কাজের মাধ্যমের ক্ষেত্রে এই শিল্পী দারুণ বৈচিত্র্যপ্রেমী এবং সাহসী। নিজেকে তিনি কখনোই কোনো একটি নির্দিষ্ট মাধ্যমে বন্দি করে রাখেননি। চারকোল, জলরং, প্যাস্টেল, অ্যাক্রিলিক এবং তেলরং সব মাধ্যমেই তার সমান ও সগর্ব বিচরণ রয়েছে। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করেন যে, প্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব একটি ভাষা, একটি আলাদা চাহিদা বা আবেদন থাকে। জলরঙের যে স্বচ্ছতা ও প্রবহমানতা, তা তেলরঙের পুরু প্রলেপে পাওয়া যায় না। আবার চারকোলের যে তীব্র বৈপরীত্য, প্যাস্টেলের স্নিগ্ধতায় তা অনুপস্থিত। এ কারণেই মাধ্যম বদলের সঙ্গে সঙ্গে তার ছবির বিষয়বস্তু এবং মেজাজেও স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। মাধ্যমই যেন কখনো কখনো তাকে বলে দেয় ক্যানভাসে কী ফুটে উঠবে।
তার কাজের বিশাল ভাণ্ডারে কিছু স্যুরিয়াল বা পরাবাস্তব কাজও রয়েছে, যা দর্শককে এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে যায়। বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল ঘটিয়ে তিনি এমন সব চিত্রপট তৈরি করেন, যা মানুষের অবচেতন মনকে নাড়া দেয়। পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জ্যামিতিক কঠোরতা এবং অর্গানিক বা জৈব ফর্মের সাবলীল সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অসাধারণ সব দৃশ্যকাব্য তৈরি করেন। তার কাজগুলো ভীষণভাবে মনস্তাত্ত্বিক। মানুষের ভেতরের অব্যক্ত আবেগ, লুক্কায়িত অনুভূতি, ভয়, আনন্দ এবং বিশেষ কোনো মুহূর্তের গূঢ় মানসিক অবস্থাকে তিনি পরম মমতায় তুলির আঁচড়ে বন্দি করেন। তার ছবিগুলো যেন একেকটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল, যা দর্শকের নিজের ভেতরেই এক আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্ট সিন বা শিল্পাঙ্গন নিয়ে শিল্পী দীপন বেশ ইতিবাচক ও আশাবাদী মনোভাব পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, দেশে এখন অনেক প্রতিভাবান শিল্পী কাজ করছেন এবং শিল্পের সমঝদারও বাড়ছে। তবে এর পাশাপাশি আমাদের দেশের অ্যাকাডেমিক শিল্পশিক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে তার নিজস্ব, তীক্ষè ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তিনি মনে করেন, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মূলত এক ধরনের অনুশীলনধর্মী বা কেবল হাত পাকানোর কাজ শেখানো হয়। ব্যাকরণ শেখা জরুরি হলেও, শিল্পের মূল উদ্দেশ্য কেবল ব্যাকরণ মেনে চলা নয়। এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে প্রতিটি শিল্পীর নিজস্ব চিন্তাভাবনা, নিজস্ব দর্শন এবং যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো ক্যানভাসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসা উচিত বলে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। অ্যাকাডেমিক ধারার গণ্ডি পেরিয়ে নিজের মতো করে স্বাধীন পথ খুঁজে নেওয়া, নিজের একটি স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করাকে তিনি একজন শিল্পীর প্রকৃত বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন।
ক্যানভাসে রঙ নিয়ে মেতে থাকা তার কাছে কোনো ধরাবাঁধা দায়িত্ব বা পেশাগত কাজ মনে হয় না। এই নিরলস সৃষ্টিশীল কাজ করে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রেরণা, সমস্ত শক্তি তিনি নিজের ভেতর থেকেই পান। বাহ্যিক কোনো চাপ বা চাহিদার কাছে তিনি নিজের শিল্পসত্তাকে সমর্পণ করেন না। সৃষ্টিশীলতার এই যে অনন্ত যাত্রা, এটি তার কাছে একান্তই এক আনন্দময় খেলার মতো। যে খেলায় কোনো হারজিত নেই, আছে কেবল সৃষ্টির উন্মাদনা আর অনন্ত আনন্দ। শিল্পী মাহমুদুর রহমান দীপন এভাবেই রঙ, রেখা আর সুরের খেলায় আমাদের উপহার দিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক মনস্তাত্ত্বিক ও বিমূর্ত দৃশ্যকাব্য।