ঈদের দিন মানুষ আনন্দ করে। আর আমরা দুই পয়সা আয়ের আশায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে পশুর চামড়া কিনি। তারপর চামড়ায় লবন দিতে হয়। সেই চামড়া হাটে এনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকার চামড়ার দাম ঠিক করে দেয় কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ট্যানারির মালিকরা হাটে আসেন নি। বাজারে র্দীঘ সময় অপেক্ষা থেকে ১৪ টি গরুর চামড়া মাত্র ৬ শ টাকায় বিক্রি করেছি। এ বছর প্রায় ১ লাখ টাকা লোকসান হবে। ধারের টাকা পরিশোধ করা নিয়ে চিন্তাই আছি।
বুধবার (৩ জুন) উত্তরবঙ্গের বৃহৎ গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর পশুর চামড়ার হাটে এভাবেই বলছিলেন সাবু মিয়া। সাবু মিয়ার বাড়ি জয়পুরহাট জেলায়। তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করেন। গতকাল বুধবার এই হাটে প্রায় ৩ লাখ টাকার চামড়া বিক্রি করতে নিয়ে এসেছেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই হাটে ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে আসেন নি। ট্রানারির মালিকদের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হাটে আসতে দেন না। তারা নিজেরাই ট্যানারির প্রতিনিধি হিবেসে কম দামে চামড়া কিনে ট্যানারি মালিকদের দেয়। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এক প্রকার বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়ে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লোকসান দিয়ে চামড়া বিক্রি করেছেন। অনেকে বিক্রি করতে না পেরে হাটে চামড়া স্তুপ করে রেখে ফিরে গেছেন।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পলাশবাড়ীর পশুর চামড়ার হাট। পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের কালীবাড়ী এলাকায় এই হাট গড়ে ওঠে। হাটটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী চামড়ার হাট। প্রায় ৪০ বছর ধরে ঈদুল আজহার পরের বুধবার এই হাট বসছে। হাটের দিন সকাল ছয়টা থেকে দিনব্যাপী হাটে চামড়া বেচাকেনা চলে। গাইবান্ধাসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখানে চামড়া বিক্রি করতে আসেন। অন্যান্য বছর ঢাকা থেকে ট্যানারি মালিকরা এখানে চামড়া কিনতে আসলেও এবছর অর্থাৎ বুধবার আসেন নি।
বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর রাত থেকে হাটে প্রচুর পরিমাণে চামড়া এসেছে। হাটের অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশে ও শেডের মেঝেতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে চামড়া। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু ক্রেতা ছিল হাতে গোনা। দু-চারজন চামড়া কিনেছেন নামমাত্র দামে। অনেকেই চামড়া বিক্রি না করে বাড়িতে ফেরত নিয়ে গেছেন। কেউ কেউ হাটেই চামড়া ফেলে রেখে বাড়ি ফিরে গেছেন। চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫৫ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু স্থানীয় পাইকাররা সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনছেন না।
পলাশবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী চামড়ার হাটে গরুর চামড়া বিক্রি করতে এসেছিলেন রংপুর মিঠাপুকুর দৌউল মির্জাপুর গ্রামের আলমঙ্গীর মিয়া (৫০)। তিনি বলেন, বুধবার সকাল সাতটার দিকে হাটে পৌঁছাই। এরপর সকাল থেকে বিকেল পযর্ন্ত অপেক্ষা করি। কিন্তু কেউ তার চামড়ার দাম বলেন নি। কেউ কেউ বললেও তা ছিল পানির দামে। একজন যে টাকা দাম করে, পরের বার অন্য পাইকার সেই দামের কম বলে।
তিনি বলেন, বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে বাধ্য হয়ে তিনি ৬০ হাজার টাকায় কেনা চামড়া মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। ফেরার সময় তারা মিয়া বলেন, দারদেনা করি ৬০ হাজার ট্যাকার চামড়া কিনছিনো। লবন ও কামলা বাবদ ৫ হাজার ট্যাকা পড়চে। আশা করেছিলাম ৯০ হাজার টাকা বেচব। কিন্তু কেউ দাম করেনা। দুই-একজনে করলেও কম দাম বলে। তাই ২৫ হাজারটাকা লোকসান দিয়া চামড়া বেঁচে দিলাম।
একই হাটে ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে এসেছিলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার চাপাদহ গ্রামের মানিক রবিদাস (৫৫)। তিনি প্রতিটি ছাগলের চামড়া ২৫০ টাকা দরে মোট সাত হাজার টাকার চামড়া কিনেছিলেন। তিনি বলেন, চামড়গুলো হাটে ফেলেই বাড়িত যাচ্ছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্রেতা বলেন, ছাগলের চামড়া ট্যানারির মালিকেরা কিনেন না। তাই সবাই ছাগলের চামড়া ফেলে দিয়ে গেছেন। এসব ছাগলের চামড়া পুকুরে মাছের খাবার জন্য প্রতি কেজি ১০ টাকা হিসাবে বিক্রি হয়।
দিনাজপুর জেলার নশরৎপুর এলাকার ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী আবদুল রশিদ (৭০) প্রায় দেড় লাখ টাকার চামড়া বিক্রি করতে এনেছিলেন এই হাটে। হাটে কোন পাইকার নেই। শুধু স্থানীয় কয়েজন ব্যবসায়ী চামড়া কিনছেন। তারা নিজেদের বিভিন্ন ট্যানারির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। মনে হচ্ছ আমরা তাদের কাছে জিম্মি।
গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোডের চামড়া ব্যবসায়ী আরশাদ আলী বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনে মজুত করেছিলেন। তাদের ভরসা ছিল, বুধবারের পলাশবাড়ীর হাট। কিন্তু হাটে ট্যানারির মালিকেরা ঢাকা থেকে চামড়া কিনতে আসেন নি। তাই অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি করতে পারেন নি।
পলাশবাড়ী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ট্যানারির মালিকদের চাহিদার ওপর চামড়ার বাজার অনেকটা নির্ভর করছে। তারা আজ হাটে আসেন নি। চামড়া কেনেননি।
এসব বিষয়ে জানতে ঢাকার এপেক্স ট্যানারির প্রতিনিধি কোরবান আলী মুঠোফোনে বলেন, এই হাটে আসা বেশিরভাগ গরুর চামড়ার মান ভাল নয়। এছাড়া লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরুর চামড়া বিক্রি করতে আনা হয়েছে। ফলে কিছু কিছু ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরা হাটে আসলেও তারা চামড়া কিনতে সাহস পান নি। তবে ভাল মানের চামড়া কেনা হয়েছে।
সরকারি দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরকারি কমিশনারকে (ভুমি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।