জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকা-ের ফলে বায়ুম-লে গ্রিন হাউজ গ্যাসের ঘনত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে গত কয়েক দশক ধরে জীবন জীবিকা, জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশ এবং সামগ্রিক পরিবেশকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার ক্রমাগত বিস্তার, নদীভাঙনের তীব্রতা, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং ঘন ঘন
প্রাকৃতিক দুর্যোগ দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব দেশের জীববৈচিত্র্য, ভূ প্রকৃতি, অর্থনীতি এবং জনজীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। পাশাপাশি, জলবায়ু-উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নীরব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সম্মুখ সারির একটি দেশ। এমন পরিস্থিতিতে আজ সারা বিশে^র পাশাপাশি বাংলাদেশেও পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’, যার বাংলা ভাবানুবাদ ‘জলবায়ু পরিবর্তন : আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’ বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
দিবস সামনে রেখে দেশ রূপান্তরকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। তিনি দেশের পরিবেশ রক্ষায় সরকার কি পদক্ষেপ নিচ্ছে সে বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় বিএনপি সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে দূষণ কমাতে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হাতে নিয়ে এগিয়ে চলছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সরকার সৌরবিদ্যুতের দিকে নজর দিচ্ছে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডিজেলচালিত বাসের দূষণ কমাতে ইলেকট্রিক বাসের (ইভি) প্রচলন করতে যাচ্ছে সরকার। মন্ত্রী কথা বলেছেন পরিবেশের উন্নয়নে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই পরিবেশ বাঁচানো সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
প্রশ্ন : এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব কতটুকু?
মন্ত্রী : এবারের প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও আমরা এখন শুধু সমস্যার কথা বলি না, আমরা সমাধানের পথে হাঁটছি। আমাদের নদীরক্ষা, প্লাস্টিক-দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সবুজ বনায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রতিপাদ্যকে আমরা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছি। বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই পরিবেশ বাঁচানো আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রমে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার নির্দেশনায় আমরা কাজ করছি।
প্রশ্ন : দেশে বনায়ন বৃদ্ধি এবং বন উজাড় রোধে আপনার মন্ত্রণালয় কী কী বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে?
মন্ত্রী : জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সরকার পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে : জলবায়ুঝুঁকি কমাতে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাকে একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সবুজ ও আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করতে সরকার সমন্বিত ও বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকাকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে রক্ষা করাকে অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রশ্ন : শহরগুলোয় বিশেষ করে ঢাকায় বায়ুদূষণ এবং প্লাস্টিক -দূষণ এখন নাগরিক জীবনের বড় সংকট। এই দুটি সমস্যা সমাধানে কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাবে কি?
মন্ত্রী : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আমরা বায়ু ও প্লাস্টিক-দূষণকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে দেখছি। বায়ুদূষণ রোধে শহরের আশপাশে থাকা অবৈধ ও পরিবেশবান্ধব নয় এমন ইটভাটাগুলো উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোতে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। বিকল্প হিসেবে পাটজাত ও পচনশীল পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সরকারিভাবে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক উৎপাদনকারী অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে আমাদের মোবাইল কোর্ট নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন। কোনো জ্বালানি পোড়াতে হয় না বলে এগুলো কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়ায় না, যা বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। তাছাড়া, তেলচালিত বাসের চেয়ে এগুলোর দৈনিক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কম।
প্রশ্ন : পরিবেশ নিয়ে সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় কি কি রয়েছে?
মন্ত্রী : বর্তমান সরকার পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ প্রবৃদ্ধির জন্য ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারমূলক (ক্র্যাশ প্রোগ্রাম) কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় সরকারের এই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার প্রধান উদ্যোগগুলো হলো খাল খনন ও জলাধার পুনরুদ্ধার : পানিসম্পদ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সারা দেশে ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা সম্ভব হবে। ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি : গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে ও জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষায় দেশজুড়ে ব্যাপক হারে সামাজিক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু হয়েছে। পরিবেশবান্ধব পরিবহন : ঢাকার রাস্তায় পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা : যানজট ও কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকার ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ইতিমধ্যে এআইভিত্তিক (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা : ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জলবায়ু ঝুঁকি এড়াতে নতুন অবকাঠামো, সড়ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ঝুঁকি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থনীতি ও বিনিয়োগসহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রশ্ন : পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রক্ষেপণ বা প্রজেকশনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিঃসরণ হ্রাসে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
উত্তর : দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত না করে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে গ্রিন হাউজ গ্যাস বা কার্বন নিঃসরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, সে লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিদপ্তরের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় উন্নত বৈজ্ঞানিক মডেলিং ও প্রক্ষেপণের ওপর ভিত্তি করে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতকে পরিবেশবান্ধব ও কম কার্বন নিঃসরণকারী খাতে রূপান্তর করা।
প্রশ্ন : জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান কী?
মন্ত্রী : বাংলাদেশ এখন জলবায়ু কূটনীতিতে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমরা শুধু আন্তর্জাতিক তহবিলের দিকে চেয়ে নেই, আমাদের নিজস্ব ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’ (বিসিসিটিএফ) দিয়ে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। তবে হ্যাঁ, উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ড আদায়ের বিষয়ে আমরা আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো দাবি ধরে রেখেছি এবং বেশ কিছু বৈশ্বিক তহবিল ইতিমধ্যে ছাড় করা সম্ভব হয়েছে।
প্রশ্ন : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের কিছু অঞ্চলে শীত এবং গরম উভয়ই বেশি। এই আবহাওয়া সহনশীল রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা?
উত্তর : বৈশ্বিক গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত নগণ্য (০.৪৮%) হলেও শিল্পোন্নত ও বৃহৎ উন্নয়নশীল দেশসমূহের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যার বিরূপ প্রভাব চুয়াডাঙ্গা এলাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। তবে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক কারণ বিধায় এটি বৈশ্বিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের আওতায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার রয়েছে।
প্রশ্ন : পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মন্ত্রী : সরকার আইন করতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সচেতনতা ছাড়া পরিবেশ রক্ষা অসম্ভব। আমি তরুণদের বলব তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। প্রতিটি নাগরিক যদি বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগান এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার বর্জন করেন, তবেই আমাদের চারপাশ বদলে যাবে। তরুণরা সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে পারে, পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে পারে। তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ একটি সবুজ ও টেকসই রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
প্রশ্ন : পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
মন্ত্রী : দেশবাসীর কাছে আমার আকুল আবেদন প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। নদী, পাহাড়, গাছপালা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমরা যেন নিজেদের ক্ষণিকের স্বার্থে প্রকৃতির ক্ষতি না করি। আসুন, এই পরিবেশ দিবসে আমরা সবাই শপথ করি ‘পরিবেশের ক্ষতি করব না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও সবুজ পৃথিবী রেখে যাব’।