রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আসছে নতুন এমডি

ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে অন্তত এক বছর কাজ করেছেন, পেশাগত দক্ষতায় এগিয়ে এবং দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ রয়েছে, তাদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১৯ ডিএমডির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকা থেকেই মাসখানেকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নতুন এমডি পেতে পারে বলে জানা গেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একাধিক সূত্র বলছে, একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে এমডি নিয়োগের আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পথে হাঁটছে না সরকার। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ডিএমডিদের মধ্য থেকেই নতুন এমডি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, রাকাব ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

সূত্রগুলো জানায়, আগামী এক মাসের মধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করতে চায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ইতিমধ্যে সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয়টিও ব্যাংকিং খাতে আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শেষ পর্যন্ত কিছু প্রার্থী রাজনৈতিক সমর্থন বা প্রভাব দেখিয়ে তালিকায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে। এ জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তৎপরতাও বেড়েছে। এদিকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গেল ১০০ দিনের উন্নয়ন তালিকায় বিভিন্ন দপ্তরে সংস্কার করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন করেনি। আ’লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালকরাই এখনো বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দায়িত্বে রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারও তাদের পরিবর্তন করেননি। যার প্রভাব ব্যাংকগুলোর ওপর পড়ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের আমলে অনেক ব্যাংকে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।  এ বিষয়ে একাধিক ব্যাংকারের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তাদের মতে, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না, বরং প্রকৃত উদ্যোক্তা নির্বাচন, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।

এ অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নতুন এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে যোগ্য, দক্ষ ও পেশাদার নেতৃত্ব নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে। তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতে নেতৃত্বের পরিবর্তন ও সংস্কার প্রয়োজন।

এদিকে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তফসিলি ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ বাধ্যতামূলক থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকে কখনোই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ১০ সদস্য রয়েছেন। সবাই ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে আছেন। সেখানে কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক নেই। এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে থেকে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী পদত্যাগ করার পর নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

আবার জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছে ৯ জন। এই ব্যাংকেও কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক নেই। একই অবস্থা অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে। প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সাতজন পরিচালক রয়েছেন। একটিতেও স্বতন্ত্র পরিচালক নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন ব্যাংকাররা। আমরাও চাই এই খাত যোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত হোক। পূর্বের সরকারের সময় অনেক এমডি তদবির করে শীর্ষ পদে অবস্থান করে নেওয়ার কথা শুনেছি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ নিয়োগ অর্থ মন্ত্রণালয় দেয়। সরকার যখন চাইবে, তখন পরিবর্তন করতে পারে। গভর্নর স্যারও বলেছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, এমডি নিয়োগে স্বচ্ছতা জরুরি।