প্রস্তাব যাচাই না করেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি

বিদ্যুতের দামবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বিরুদ্ধে প্রস্তাব যাচাই না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দামবৃদ্ধির বিষয়ে শুনানির আগেই প্রথম দুই ধাপের (শূন্য থেকে ৫০ এবং শূন্য থেকে ৭৫) গ্রাহকের দাম বৃদ্ধি না করতে একটি সম্পূরক প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। কিন্তু বিইআরসি ওই আবেদন আমলে না নিয়ে আবাসিক সব গ্রাহকের দাম বৃদ্ধি করে। গরিব মানুষের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সমালোচনার মুখে গতকাল পিডিবি পুনরায় একই প্রস্তাব নিয়ে কমিশনে যায়। নিজেদের ভুল আড়াল করতে তড়িঘড়ি করে গতকাল বিকেলেই বর্ধিত দাম প্রত্যাহার করার আদেশ দেয় বিইআরসি।

গত ৩ জুন বিইআরসি নতুন বিদ্যুতের দর ঘোষণা করে। সেখানে লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং ০-৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। আগের আদেশ বাতিল হওয়ায় এখন লাইফলাইনে আগের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং ০-৭৫ ইউনিটের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকছে। পুরনো দাম বহাল থাকায় বিতরণ কোম্পানিগুলোর বছরে প্রায় ৭৮১ কোটি টাকা আয় কমবে।

বিদ্যুৎ বিতরণে আবাসিক শ্রেণিতে ছয়টি সø্যাব বা ধাপ রয়েছে। ধাপ অনুযায়ী গ্রাহক বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে থাকে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার ০-৫০ ইউনিটের ধাপে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। সাধারণত এ ধাপে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ চিন্তা করে থাকে। অতীতেও বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির সময় এই ধাপে খুব একটা দামের হেরফের হয়নি। তিনটি বাতি এবং দুই পাখা চালালে মাসে একজন গ্রাহক ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকেন। গ্রামের বর্গাচাষি কিংবা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ঘরে স্বল্পমূল্যে আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকার লাইফলাইন গ্রাহককে আলাদা দৃষ্টিতে দেখে। সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে একজন মানুষ যদি কেরোসিনের তুলনায় কম দামে বিদ্যুৎ পায়, তাহলেই সে বিদ্যুৎ সংযোগ নেবে। কারও ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে সেই ঘরের শিশুরা একটু বেশি সময় রাতে পড়তে পারবে। প্রতিদিন যদি একটি শিশু গড়ে এক ঘণ্টা করেও বেশি পড়ে, তাহলে ৩৬৫ দিনে সে ৩৬৫ ঘণ্টা বেশি পড়বে। এতে তার জীবন বদলে যেতে পারে। আবার একটি ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বললে গৃহিণীরা রাতে একটু বেশি সময় স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারেন। সারা দেশে এ ধরনের গ্রাহক রয়েছেন ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার। এর মধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১টি বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে গ্রামে।

এ শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নত হলে তাদের আর্থিক সঙ্গতি বাড়তে পারে। এতে তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে পারেন। ঠিক এর পরের ধাপটি শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের। এ ধাপের সুবিধা অন্য গ্রাহক পেলেও লাইফলাইন থেকে উঠে আসা গ্রাহক এ ধাপে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দুটি ধাপ রাখাই হয়েছে একেবারে গরিব মানুষকে স্বস্তি দিতে। এ জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়ার পর একটি সম্পূরক প্রস্তাব দিয়ে এ দুই ধাপের দাম না বাড়ানোর আবেদন করে। গত ২০ এবং ২১ মে দাম বাড়ানোর আবেদনের ওপর গণশুনানি হয়।  গণশুনানির পর প্রস্তাবটি জমা দেয় পিডিবি।

পিডিবির সদস্য (বিতরণ) মো. আব্দুল বাছিদ গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রস্তাবটি আজ জমা দিয়েছি, বিষয়টি এমন নয়। দামবৃদ্ধির গণশুনানির দিনই আমরা সম্পূরক প্রস্তাব দিয়ে বলেছিলাম শূন্য থেকে ৫০ এবং শূন্য থেকে ৭৫ এই দুই ধাপে দামবৃদ্ধির প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ প্রস্তাব আমলে না নিয়ে গত বুধবার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সঙ্গত কারণে আমরা আজ (বৃহস্পতিবার) পুনরায় আগের প্রস্তাবটি জমা দিয়েছি।’

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা তো অনেক প্রস্তাবই করেছিল, সব কি আমরা আমলে নিয়েছি? তারা তো ২০০ ইউনিট পর্যন্ত একটি সø্যাব করতে বলেছিল, আমরা কী করেছি?’ গরিব মানুষের বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, করা হয়েছিল’।

তখন আমলে না নিয়ে এখন কেন এক দিনের ব্যবধানে আদেশটি পরিবর্তন করা হলো এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিষয়টি তখন খেয়ালই করেনি কমিশন।’

আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দামের গণশুনানির পর ৯০ দিনের মধ্যে আদেশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এবার ২১ মে গণশুনানি শেষ হয়। গত ৩ জুন বিদ্যুতের বর্ধিত দাম ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে সময় ছিল ১৩ দিন। এর মধ্যে ঈদের ছুটি ছিল সাত দিন। সে হিসাবে মাত্র পাঁচ কার্যদিবস যাচাই করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়। কয়েক লাখ কোটি টাকার হিসাব করার জন্য পাঁচ দিন সময় যথেষ্ট নয় বলে মনে করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে বিইআরসির বদলে সরকার নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করতে পারবে এমন একটি পৃথক আইন করা হয়। তখন বিইআরসি দাম বৃদ্ধিতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে বলে অভিযোগ তোলা হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এ আইন বাতিল করে দাম বৃদ্ধির ক্ষমতা আবার বিইআরসির কাছে ফেরত দেয়। তারপরও সরকারের কথা শুনলে আবার সরকার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে বলে এক ধরনের ভয় তাড়া করে বিইআরসি কর্মকর্তাদের। এ জন্য যাচাই করার চেয়ে সরকারের চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে উঠে-পড়ে লেগেছে বিইআরসি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান দামবৃদ্ধির কথা বললে বিইআরসি বিশেষ

পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বিষয়টিকে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ভুল হিসেবেই দেখতে চান। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, তারা হয়তো কোনো কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। কাজ করতে গেলে মানুষের ভুল হতেই পারে। তবে এটি দ্রুত সংশোধন করেছে। আশাকরি মানুষ এটি বুঝতে পারবে।