চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র আগ্রাবাদ বারিক বিল্ডিং মোড়ে একে খান গ্রুপের বাউন্ডারি দেওয়া বিশাল একটি জায়গা বর্তমানে গাড়ির গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ ২০০০ সালের ম্যাপেও এই জায়গায় পুকুর ছিল। এর পাশেই বিরাট এলাকাজুড়ে নাভানা সিএনজির একটি কারখানা রয়েছে। এই জায়গাটিও বিএস রেকর্ডে (দাগ নম্বর ২০১৮) পুকুর হিসেবে চিহ্নিত। এমন চিত্র শুধু আগ্রাবাদ এলাকায় নয়, পুরো নগরজুড়ে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে বিএস জরিপে ৪ হাজার ৫৯৭টি পুকুর-দিঘির অস্তিত্ব থাকলেও এগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৪৫৯টি ভরাট হয়ে গেছে। নগরজুড়ে এভাবে পুকুর-জলাশয় কমে যাওয়ায় নগরীর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নগর পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে।
২০০০ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, আগ্রাবাদের গোসাইলডাঙ্গা বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে বনানী পর্যন্ত শেখ মুজিব রোডের ডান দিকে অনেকগুলো পুকুর রয়েছে। স্যাটেলাইট ও বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে গোসাইলডাঙ্গা সার্বজনীন রাধা-কৃষ্ণ মন্দিরের সামনে যাই। সেখানে একটি বিশাল গ্যারেজ আছে। একেখান গ্রুপের সাইনবোর্ড টানানো এলাকাটি সীমানা প্রাচীরে ঘেরা। মন্দিরের পাশে টং দোকান করছেন ৪২ বছর বয়সী রতœা চৌধুরী। এখানে কোনো পুকুর ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তখন ছোট ছিলাম। রাস্তার অপর পাশে ছিল আমাদের বাড়ি। এই পাড়ে (মন্দিরের অংশে) এখন আমার শ্বশুরবাড়ি। মন্দিরের পেছনে গ্যারেজটির জায়গায় একটা বিশাল পুকুর ছিল। পুকুর ভরাট করে গ্যারেজ করা হয়েছে। এছাড়া সামনে নাভানার যে কারখানাটি দেখছেন এখানেও একটি বড় পুকুর ছিল।
চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনের সামনে গড়ে উঠা নাভানা সিএনজি কারখানাটি পুকুরের মধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানান এই এলাকায় ৩৫ বছর ধরে বসবাস করা জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, শুধু এই পুকুরই নয়, বর্তমানে শেখ মুজিব রোডের বিপরীতে যে আইআইইউসি টাওয়ার আছে, সেখানেও একটি পুকুর ছিল। এখানে অনেক জায়গাতেই পুকুর ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ভরাট করে ভবন নির্মিত হয়েছে। উল্লেখ্য, আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ‘জলবায়ু পরিবর্তন : আজকের পদক্ষেপ আগামীর নিরাপত্তা’ প্রতিপাদ্যে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি পালন করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে পশ্চিম মাদারবাড়ি ২ নম্বর গলির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে মিছি পুকুর পাড়। কিন্তু পুরো এলাকা ঘুরেও পুকুর পাওয়া যায়নি। কথা হয় ৫২ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিক উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি এই এলাকায় লন্ড্রির দোকানে কাজ করছেন। রফিক উদ্দিন বলেন, আমি বুঝদার হওয়ার পর জেনেছি, এখানে একটি বড় পুকুর ছিল। সেটি ভরাট হয়ে গেলেও এলাকাটি পুকুরটির নামে রয়ে গেছে।
শুধু কি তাই? নগরীর আন্দরকিল্লায় রাজাপুকুর লেন বলে একটি এলাকা রয়েছে। যে পুকুরের নামে এলাকাটি পরিচিত বাস্তবে সেটির কোনো অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী মোসতাক খন্দকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৯৬৩ সাল থেকেই এই এলাকায় বসবাস করছি। এখানে ছিল চাকমা রাজার বাড়ি। সেই বাড়ির একটি বিশাল দিঘি ছিল, সেটি ভরাট করে চেরাগী পাহাড় মোড়ের আজাদী অফিসের পেছন থেকে ডিসি হিলের পাদদেশ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকায় দেওয়ানজী পুকুর লেন বলে বিখ্যাত একটি এলাকা রয়েছে। এখানে একসময় পুকুর থাকলেও বর্তমানে মন্দির ও বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। চকবাজারের কিশলয় কমিউনিটি সেন্টারের জায়গায় ছিল কমলদহ দিঘি, মাইল্ল্যার দিঘি ভরাট করে হয়েছে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম চান্দগাঁও মৌলভি পুকুর ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন, কর্নেলহাটে প্রশান্তি আবাসিক এলাকাটি গড়ে উঠেছে কাট্টলী দিঘি ভরাট করে। এভাবে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও দিঘি ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ওইসব পুকুর না থাকলেও রয়ে গেছে সেগুলোর পাড়।
বেশি ভরাট হয়েছে পূর্ব ষোলশহরে : ১৯৮০-৮২ সালের বিএস সার্ভের পর সিডিএ চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের আওতায় ডিটেইল সার্ভে করে ২০২৩ সালে। সেই সার্ভেতে দেখা যায়, বিএস রেকর্ডে ৪ হাজার ৫৯৭টি পুকুর-জলাশয় থাকলেও ভরাট হয়ে গেছে ২ হাজার ৪৫৯টি। মাত্র ৪১ বছরে এসব পুকুর-জলাশয় হারিয়ে গেছে। আর এই ভরাটের শীর্ষে রয়েছে পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডে ৩৭৮টি পুকুর-জলাশয়ের মধ্যে ২২৫টি ভরাট হয়ে গেছে। আর নগরীর বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে ২৮৫টি পুকুর-জলাশয়ের মধ্যে ২০৪টি ভরাট হয়ে গেছে।
পুকুর-জলাশয় ভরাটে বাড়ছে গরমের অনুভব : পুকুর-জলাশয় পরিবেশের তাপমাত্রাকে শীতল রাখে উল্লেখ করে বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে নগরগুলো হিট আইল্যান্ডে রূপান্তরের অন্যতম কারণ হলো পুকুর-জলাশয় এবং সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়া।। অপরদিকে জলবায়ু বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটির অধ্যাপক শাহানা আফরোজ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহরে সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়া, পুকুর-জলাশয় ভরাট এবং উঁচু ভবন, এসি ব্যবহারের ফলে শহরগুলোতে হিট আইল্যান্ড তৈরি হয়ে তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হয়।’ এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রিজিলেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শহরগুলোতে অনুভব তাপমাত্রা রেকর্ডকৃত তাপমাত্রার চেয়ে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়ে থাকে। এর অন্যতম কারণ হলো নগরীতে জনঘনত্ব এবং সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়া।’
শ্রীহীন হয়ে পড়ছে নগর : একটি নগরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নগরে পশুপাখিসহ বিভিন্ন ধরনের জীববৈচিত্র্যের মিশেল থাকতে হবে। কিন্তু নগরে পুকুর-জলাশয় ভরাট হয়ে নগরের জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, একটি পুকুরকে কেন্দ্র করে সেখানে পাখিসহ বিভিন্ন ধরনের জলজ প্রাণী বসবাস করে। অনেক কীটপতঙ্গ ও প্ল্যাঙ্কটন থাকে। পুকুর-জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এগুলো নগর থেকে হারিয়ে যায়।। একই মন্তব্য করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল বলেন, ‘নগরগুলোতে পুকুর-জলাশয় না থাকায় বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে শহরগুলো বসবাসের পরিবেশ হারাচ্ছে।’ পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘শহরে পুকুর-জলাশয় যত বেশি থাকবে, ততই শহর বসবাসযোগ্য থাকবে।
আগুনে নেভানোর পানি পাওয়া যায় না : নগরগুলোতে এখন জনঘনত্ব বেশি উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে পুুকুর-জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে কোথাও আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য পানি পাই না। এতে নগরবাসীর ঝুঁকি বাড়ছে।
পুকুর-জলাশয় রক্ষায় আইনে কী আছে : জলাশয় সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী পুকুর-দিঘি ভরাট নিষিদ্ধ। ভূমি রেকর্ডে (আরএস, বিএস) কোনো জলাশয় থাকলে তা কোনোভাবেই ভরাট করা যাবে না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) পুকুর ভরাট বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে সিডিএ ২০ বছরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছে। এ বিষয়ে সিডিএর উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের পরিচালক আবু ঈসা আনসারী বলেন, ‘ড্যাপে বলা আছে, ১৫ কাঠা আয়তনের বড় পুকুর-জলাশয়ে কোনোভাবে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। একইভাবে মাস্টারপ্ল্যানে পুকুর-জলাশয় ভরাট না করার বিধান রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মহানগরীর সব পুকুর-দিঘি চিহ্নিত করেছি। বিএস রেকর্ডে পুকুর থাকার পরও যারা ভরাট করেছে, সেখানে কোনো ভবনের অনুমোদন দেব না।’
তাহলে উপায় কী : নগরগুলো পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি পুকুর-জলাশয় ভরাট করা যাবে না উল্লেখ করে বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শহরমুখো হবে। তাদের কীভাবে জায়গা দিতে হবে তা নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করতে হবে। একই সঙ্গে সবুজের পরিমাণ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে শহর ও পৌরসভার বড় পুকুর ও জলাশয়গুলো সরকার অধিগ্রহণ করে নিতে পারে। তাহলে আগামীতে আর কেউ ভরাট করতে পারবে না।
এ বিষয়ে সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারী বলেন, আমরাও এই পন্থায় অগ্রসর হচ্ছি। সরকার একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য অর্থ খরচ করতে পারলে পরিবেশ রক্ষার জন্য পুকুর-জলাশয় কেন অধিগ্রহণ করবে না। এভাবেই পুকুর-জলাশয়গুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে।