পরিবেশ রক্ষা আজ বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারে পৃথিবী যখন নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন দেড় হাজার বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। তিনি পরিবেশ সংরক্ষণকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন।
তিনি বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিয়েছেন এবং এটিকে সদকায়ে জারিয়ার মর্যাদা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা অন্য কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি)
পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নবীজি (সা.) ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি পানির অপচয় কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। একবার তিনি সাহাবি সাদ (রা.)-কে অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে বলেন, ‘এই অপচয় কেন?’ সাদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, অজুতেও কি অপচয় হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবাহমান নদীর তীরে থাকো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)
প্রাণীর প্রতিও নবীজি (সা.) দয়ার আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অকারণে প্রাণী হত্যা, কষ্ট দেওয়া ও অপব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক নারী একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গিয়েছিল, সে তাকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবারও দেয়নি, ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে খাবার খেতে পারত। (সহিহ বুখারি)
এ ছাড়া রাস্তা, জনপথ ও জলাশয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারেও নবীজি (সা.) গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা ইমানের অংশ। (সহিহ মুসলিম) মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা অনুসরণ করলে পরিবেশবান্ধব, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন করা সম্ভব। কিন্তু আমরা তার শিক্ষা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি।
এক সময় বাংলাদেশ ছিল সবুজেঘেরা সজীব ভূখণ্ড। আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় সবুজের সেই সমারোহ হারাতে বসেছে। একদিকে নির্বিচারে গাছ কাটা, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। অথচ মানুষের সুস্থতা, বেঁচে থাকা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সবকিছুর সঙ্গে এই পরিবেশ ও বৃক্ষজগতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন বাড়ানো খুবই জরুরি।
ইসলাম এই বনায়নের বিষয়টিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উপায় হিসেবে নয়, বরং মহান সওয়াবের কাজ হিসেবেও তুলে ধরেছে। কোরআন-হাদিসে সর্বত্রই গাছপালা, ফলবান বৃক্ষ, তৃণভূমি ও সবুজ প্রকৃতির মহিমা বর্ণিত হয়েছে। গাছপালা সংরক্ষণ ও রোপণের নির্দেশ দিয়েছেন নবীজি (সা.)। এমনকি কেয়ামতের মুহূর্তে যদি কারও হাতে গাছের একটি চারা থাকে, তাও যেন রোপণ করতে দেরি না করে, এই আহ্বান ইসলামের পরিবেশ চেতনার সর্বোচ্চ উদাহরণ।
ইসলাম মানুষের আত্মিক বিপর্যয় ঠেকানোর পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয় রোধেও সদা তৎপর। ইসলাম সর্বদাই মানুষের কল্যাণের চিন্তা করে। প্রাকৃতিক এ পরিবেশ আল্লাহতায়ালা মানুষের কল্যাণেই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং এর সংরক্ষণের কাজটা নিজেদের কল্যাণে নিজেদেরই করতে হবে।
পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বনভূমি সৃষ্টি করার নাম বনায়ন। যেকোনো স্থানে এই বনায়ন করা যেতে পারে। যেকোনো ধরনের বৃক্ষরোপণকেই বনায়ন বলে। ক্রমবর্ধমান আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় দিন দিন আমাদের থেকে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাচ্ছে। ফলে সমাজ ও মানুষ দিন দিন প্রাকৃতিক বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের পথ হলো, পরিকল্পিত বনায়ন তৈরি করা।
দুনিয়াতে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, সবই মানুষের উপকারের জন্য। এর অন্যতম সৃষ্টি হলো, গাছপালা, বৃক্ষলতা, তৃণভূমি। মানুষের প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ হিসেবে ফলবান বৃক্ষরাজি ও সবুজ-শ্যামল বনভূমি দ্বারা একে সুশোভিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় পরিবেশ ও
প্রকৃতির ভারসাম্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই গাছপালা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, যা থেকে তোমাদের পানীয় ব্যবস্থা হয়। আর তা থেকেই গজায় উদ্ভিদ। যা তোমরা চারণভূমির কাজে ব্যবহার করো।’ (সুরা নাহল ১০)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে এবং তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা। তাতে উৎপন্ন করেছি চিত্তাকর্ষক সব ধরনের বৃক্ষলতা, গাছপালা। আকাশ থেকে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি। এর দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান, পরিপক্ব শস্যরাজি এবং সমুন্নত খেজুর গাছ। যাতে আমার বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর রয়েছে।’ (সুরা কাফ ৭-১১)
গাছপালা ও ঘন বন বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। দেশে বজ্রপাতের হার বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, বনাঞ্চল থেকে বৃক্ষ উজাড় হয়ে বন শূন্য হয়ে যাচ্ছে। বনায়ন ও বনভূমি বায়ুমণ্ডলের পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত রাখে। বৃক্ষলতা সময়মতো বায়ুমণ্ডলকে পরিশুদ্ধ করে। পরিবেশকে প্রয়োজনে শীতল করে, আবার উষ্ণও করে। অনুরূপভাবে যেখানে গাছপালা ও বনভূমি বেশি থাকে, সেখানে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হয়। ফলে ভূমিতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। সেখানে চাষাবাদ ও ফল-ফসলের
উৎকৃষ্টতা পাওয়া যায়। যে ভূমিতে গাছপালা বেশি হয়, সে স্থানের মাটিতে উর্বরতা ও ইউরিয়ার পরিমাণ বেশি থাকে। যা বৃক্ষলতা গজানোর ক্ষেত্রে বেশ শক্তি সঞ্চার করে। ভূমির ক্ষয়রোধ করে। ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে। আমাদের জীববৈচিত্র্যও বিপন্ন হবে বনাঞ্চল না থাকলে। তাই সুস্থ জীবন, নিরাপদ প্রাণীবৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখতে বনায়নের বিকল্প নেই।
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে খেজুর ও আঙুর গাছের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য তা দ্বারা খেজুর ও আঙুরের বাগান সৃষ্টি করি।’ (সুরা মুমিনুন ১৯) লাউগাছ বা লতাপাতাযুক্ত গাছের আলোচনাও এসেছে কোরআনে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার কাছে লতাপাতাযুক্ত (লাউ জাতীয়) গাছ উদগত করেছি।’ (সুরা সাফফাত ১৪৬) এভাবে জলপাই গাছ, কুলগাছের আলোচনাও বিবৃত হয়েছে কোরআনে কারিমে। মহান আল্লাহ কৃষকদের সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা জমিতে যা বপন করো, এগুলো কী তোমরা উদগত করো, নাকি আমি করি?’ (সুরা ওয়াকিয়া ৬৩-৬৪)
পরিবেশের ওপর গাছের প্রভাব থাকায় রাসুল (সা.) গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন। মানুষ যেমন গাছ থেকে জীবনযাত্রার উপায়-উপকরণ খানা-খাদ্য সংগ্রহ করে, তেমনি হাজারো পশুপাখি বনের ওপর নির্ভর করেই জীবন অতিবাহিত করে। বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটাকে রাসুল (সা.) নিরুৎসাহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের ময়দানেও অমুসলিম শত্রুদের গাছ কর্তন করতে নিষেধ করেছেন। মুতার যুদ্ধে সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘তোমরা কোনো খেজুর বৃক্ষ জ্বালিয়ে দেবে না এবং অকারণে কোনো বৃক্ষ কর্তন করবে না।’ অপর এক হাদিসে এসেছে, তিনি এমন ঘৃণিত কর্ম সম্পাদনকারী সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে কাঁটাযুক্ত কোনো বৃক্ষ কর্তন করবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)
বাংলাদেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি দুর্যোগপ্রবণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের অনেক কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, বনাঞ্চল উজাড় করা। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকাতে বনভূমির অবদান অগ্রগামী। গাছপালা ছাড়া পরিবেশ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। সুতরাং এ দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে ব্যাপক বনাঞ্চলের প্রয়োজন। আর বনাঞ্চল সৃষ্টিতে বনায়নের বিকল্প নেই। ইসলাম বনায়নের তাগিদ দিয়েছে। আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে, কেয়ামত এসে গেছে, তখনো তোমার হাতে যদি গাছের একটি চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করে দেবে। (রোপণ করতে দেরি করবে না)।’ (মুসনাদে আহমদ)
এই হাদিসের আহ্বান সমাজে ছড়িয়ে সামাজিকভাবে বনায়ন ও কৃষি কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পরিবেশ রক্ষার শক্তিশালী উপায় হিসেবে পর্যাপ্ত বনাঞ্চল সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণœ রাখতে হবে। এখন যদি ইসলামের এই গুরুত্বকে পাশ কাটিয়ে বনভূমি উজাড় করে নগরায়ণ ও রাস্তা তৈরির নামে সারি সারি গাছ কাটা হয়, তাহলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক