আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রচেষ্টা যখন চরম জটিলতার মুখে, ঠিক তখনই লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রতি নিজেদের জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
মধ্যপ্রাচ্যের এই আঞ্চলিক যুদ্ধ এখন চতুর্থ মাসে পদার্পণ করেছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরুর প্রধান শর্তই হলো- ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার দুই দিন পর, মার্চের শুরুতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে এই লড়াই শুরু হয়। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়েই তারা এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল ‘আল মায়াদিন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘লেবাননে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই সামগ্রিক যুদ্ধের অবসান ঘটবে না। লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনীকে অবশ্যই তাদের দখলকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একটি চুক্তি হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম প্রত্যাখ্যান করার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য সামনে এলো। উল্লেখ্য, ওই খসড়া চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত ছিল না এবং হিজবুল্লাহকেও সেই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এদিকে আমেরিকার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। তেল আবিব সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না এবং সেনা প্রত্যাহারও করবে না। এর জবাবে গত শুক্রবার হিজবুল্লাহ জানায়, তারা দক্ষিণ লেবাননে সদ্য দখলকৃত ঐতিহাসিক 'বোফোর্ট ক্যাসেল' এলাকাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর দুটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজায়েই বলেন, ‘চলতি যুদ্ধে হিজবুল্লাহ বিশাল ত্যাগ স্বীকার করেছে। তারা আমাদের মিত্র। ফলশ্রুতিতে, হিজবুল্লাহর প্রতি আমাদের সমর্থন অটুট রয়েছে এবং তাদের প্রতি আমাদের যে প্রতিশ্রুতি, তা রক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে পুনরায় হামলা শুরু করার বিষয়ে ইসরায়েলি হুমকির কড়া সমালোচনা করে রেজায়েই বলেন, আজ আমরা এই পাপিষ্ঠ সরকারকে আবারও সতর্ক করছি যেন তারা লেবানন ছেড়ে চলে যায়। তাদের জানা উচিত, যেকোনো চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে লেবানন।
অন্যদিকে লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং হিজবুল্লাহর মিত্র নাবিহ বেরি শুক্রবার জানান, ইসরায়েলি বাহিনী যদি একই সঙ্গে লেবাননের ভূখণ্ড ত্যাগ করে, তবে তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর সেনা সরিয়ে নিতে সম্মত আছেন। তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফাউন শুক্রবার সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস লেবাননকে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
লেবাননের পাশাপাশি চলতি সপ্তাহে গাজা, উত্তর ইসরায়েল এবং কুয়েতেও ব্যাপক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির ফলে লড়াই পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এখন ‘তুলনামূলক নরম বা সহনীয় উপায়ে’ গোলাগুলি চলছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার ওমান সাগরে এক নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের নৌবাহিনী দাবি করেছে, সমুদ্রসীমায় ‘উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড, হয়রানি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার ছিনতাই’ ঠেকাতে তারা মার্কিন ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী জানিয়েছিল, তারা ভারত মহাসাগরে ইরানকে রসদ সরবরাহকারী সন্দেহভাজন একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে তল্লাশি চালিয়েছে এবং ইরানের পক্ষে কাজ করা এমন জাহাজগুলোর পথরোধ করা অব্যাহত রাখবে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ‘ইরানি বাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে কোনো হামলা বা গুলি চালায়নি। এমন কিছু করা হলে তা হতো যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন।’
এদিকে ওমানের ‘মিনা আল ফাহাল’ টার্মিনালে একটি ড্রোন হামলার কারণে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সাময়িকভাবে তেল লোডিং কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তবে সূত্র মতে, পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, তেহরান মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়। এর ফলে এই জলপথ দিয়ে বর্তমানে আগের তুলনায় মাত্র সামান্য কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে। অথচ পূর্বে বিশ্ব বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হতো।
এই সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে এবং সামগ্রিক পণ্য সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি শুক্রবার সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আমেরিকা ও ইরান বর্তমানে মূলত পরোক্ষ আলোচনায় লিপ্ত রয়েছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির চেষ্টা চলছে, যার মাধ্যমে সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য তুলে রাখা হবে।
চুক্তির অংশ হিসেবে তেহরান তাদের আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রির অর্থ ফেরত চায়। সেই সঙ্গে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি নিজ দেশে একটি অপ্রিয় যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন, তিনি জানিয়েছেন—তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদ-রেজা হাজি বাবাই শুক্রবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইরানের আইনগত অধিকার। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, ইরানের কাছে থাকা ‘সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা’ আসলে কোনো অস্ত্র নয়, বরং তা হলো কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালী’।
সূত্র: রয়টার্স