ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আলোচনার জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই মুহূর্তে জেলেনস্কির সঙ্গে বসার কোনো যৌক্তিকতা তিনি দেখছেন না।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পুতিনকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি পাঠান ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। চিঠিতে তিনি সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়ে লেখেন, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধটি পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের কেন্দ্রে আসার জন্য ‘কেবল অপেক্ষা করে থাকা ভুল হবে’। একই সঙ্গে জেলেনস্কি একটি যুদ্ধবিরতিরও অনুরোধ জানান। তবে চিঠিতে তার সুর ছিল বেশ অবমাননাকর ও কিছুটা উপহাসমূলক।
জেলেনস্কির এই চিঠিকে ‘অভদ্রোচিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন পুতিন। শুক্রবার (৫ জুন) সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় জেলেনস্কির প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না—জানতে চাওয়া হলে পুতিন বলেন, ‘আপাতত আমি এর কোনো যৌক্তিকতা দেখছি না।’
পুতিন আরও বলেন, ‘এটি কি সরাসরি বৈঠকের পরিবেশ তৈরির একটি প্রচেষ্টা ছিল, নাকি বৈঠক এড়ানোর কৌশল? আমার মনে হয় এটি দ্বিতীয়টিই ছিল।’ তিনি পুনরায় তার অবস্থানে অনড় থেকে বলেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতির আগে অবশ্যই শান্তি আলোচনা হতে হবে।
পুতিনের এমন প্রতিক্রিয়ার পর জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে লিখেছেন, রাশিয়া ‘আবারও যুদ্ধকেই বেছে নিচ্ছে’। তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (পুতিন) আসলে যুদ্ধ বন্ধ করতে চান না। আমার মনে হয় তার এই জবাবে বিশ্বের অনেকেই হতাশ হয়েছেন।’
বক্তব্যে পুতিন স্পষ্ট করে বলেন, কিয়েভের কাছ থেকে মস্কো যেসব ছাড় চাইছে তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি দেওয়া হলে ইউক্রেন কেবল নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, ‘তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে থামানো। কিন্তু আমাদের চুক্তি দরকার—ছয় মাস বা তিন মাসের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি। আগে বিশেষজ্ঞদের কাজ করতে দিন এবং একটি সমাধানে পৌঁছাতে দিন; এরপর আমরা বৈঠক করতে পারি।’
রাশিয়ার লক্ষ্য পূরণ হলেই কেবল এই যুদ্ধ শেষ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে, আমরা নিজেদের জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি তা অর্জিত হলেই সামরিক অভিযান শেষ হবে।’
মস্কোর দীর্ঘদিনের দাবি—ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ন্যাটো জোটে যোগদানের প্রচেষ্টা ত্যাগ করতে হবে। তবে কিয়েভ কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, মস্কোকে কোনো ছাড় দিলে তা ভবিষ্যতে তাদের আবারও আক্রমণে উৎসাহিত করবে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের আট বছর পর রাশিয়া যে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালিয়েছে, কিয়েভ সেটিও স্মরণ করিয়ে দেয়।
জেলেনস্কি তার চিঠিতে পুতিনকে খোঁচা দিয়ে লিখেছিলেন, ‘২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বয়স এখন পুতিনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।’ পাশাপাশি তিনি রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। গত বৃহস্পতিবার সেন্ট পিটার্সবার্গে হওয়া একটি হামলাকে জেলেনস্কি ‘সাক্ষাৎ করতে যাওয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেন। পুতিন একে ‘বেশ কিছু অভদ্রোচিত মন্তব্য’ বলে অভিহিত করেছেন।
যদিও জেলেনস্কির এই চিঠির বিষয়বস্তু হোয়াইট হাউসসহ কিছু মহলে শান্তির আশা জাগিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, দুই নেতার এই বৈঠকটি হলে তা ‘দারুণ হতো’।
এদিকে, ইউক্রেন শুক্রবার জানিয়েছে যে তারা আজভ সাগর এবং রাশিয়ার দখলে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলের জলসীমায় অবৈধ পণ্যবাহী পাঁচটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন কমান্ডার রবার্ট ব্রোভডি জানান, এই জাহাজগুলো ইউক্রেনীয় শস্য ‘চুরি’ এবং জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ছিল।
আজভ সাগরে দুটি জাহাজে হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই হামলা কারা চালিয়েছে তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি তারা এবং জাহাজগুলো আজারবাইজানের নয় বলেও উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন পরিচালিত একটি ড্রোন রোমানিয়ার কৃষ্ণসাগর বন্দর কনস্টান্টায় বিস্ফোরিত হয়েছে। ইউক্রেনীয় অপারেটররা জানিয়েছে, রাশিয়ার ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপে ড্রোনটি তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং আরও ৭০ জন আহত হয়েছেন। কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি দুগ্ধ খামারে হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া খেরসনে একটি পেট্রোল পাম্পে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারী প্রাণ হারিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি