খায়দায় চান মিয়া, মোটা হয় জব্বার। ব্যঙ্গাত্মক অর্থে এমন প্রবাদের বহুল প্রচলন রয়েছে। একজনের সাফল্য অন্য কেউ বিনা কষ্টে বাগিয়ে নিলে এই প্রবাদ ব্যবহার হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি অনেকটা চান মিয়া আর জব্বার সমীকরণে আটকে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশর জ্বালানি সরবরাহে সরকারি পর্যায়ে একটি চুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া মেনে চলা বাধ্যতামূলক না হলেও দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) রয়েছে। এর মধ্যে একটি কোম্পানির সঙ্গে আবার সুনির্দিষ্টভাবে হেডস অব অ্যাগ্রিমেন্ট (এইচওএ) সই করা হয়েছে।
নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের জন্য এসব চুক্তি করা হয়েছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার এবং সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের কণ্ঠেও একই সুর লক্ষ করা গেছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি মূলত মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে ভিন্ন উৎস সৃষ্টি হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংকট তৈরি হলে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
তবে যদি দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ চুক্তি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই এলএনজি সরবরাহ করছে তাহলে কি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নির্ভরতা কমে কি না, এমন প্রশ্নও তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এক্সিলারেট এনার্জি ইরান যুদ্ধের সময় ফোর্স মেজর ডিক্লেয়ার করে। ফোর্স মেজর হচ্ছে একটি বিশেষ সুবিধা। যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উভয় পক্ষ চুক্তির ধারা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ধারা প্রয়োগ করতে পারে। ইরান কাতারের এলএনজি সরবরাহকেন্দ্রে হামলা করলে কাতার বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা চুক্তিতে ফোর্স মেজর ডিক্লেয়ার করে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশকে গ্যাস দেয়নি কাতার। বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাস রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব শেষ করে যাওয়ার পরপর ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির উপদেষ্টা হিসেবে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আমেরিকার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের টানাপড়েনের সেই ক্ষণে ওই বছরের ৯ নভেম্বর এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকারকে দূরত্ব ঘুচিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল সাবেক সরকারের কেউ কেউ। যদিও সেই সুখ খুব বেশি দিন সহ্য হয়নি।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এক্সিলারেট এনার্জির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিংয়ের কাছ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে ০.৮৫ থেকে ১ (মিলিয়ন টন) এমটিপিএ এলএনজি আমদানি করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী এক্সিলারেট ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করার কথা ছিল।
পেট্রোবাংলার একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং মূলত ট্রেডিং কোম্পানি। তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্যাস কিনে আমাদের সরবরাহ করে। কাতারে হামলার সময় তারাও ফোর্স মেজর ডিক্লেয়ার করে। তাদের নিজেদের এলএনজি থাকলে এই সমস্যা সৃষ্টি হতো না।
বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৩ সালের নভেম্বরে চুক্তি হওয়ার পর এক্সিলারেট এনার্জি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কাতার এনার্জির সঙ্গে এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে। এক্সিলারেট বলছে কাতার থেকে কেনা এলএনজি তারা মূলত বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। বাংলাদেশে ‘ডেলিভার্ড এক্স-শিপ’ ভিত্তিতে কাতার এনার্জি থেকে বছরে সর্বোচ্চ এক মিলিয়ন টন এলএনজি ১৫ বছরের জন্য ক্রয় করবে, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হবে। চলতি বছর এবং আগামী বছর এক্সিলারেট ০.৮৫ এমটিপিএ এলএনজি ক্রয় করবে এবং ২০২৮ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত এক এমটিপিএ এলএনজি ক্রয় করবে।
কাতার এনার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের আগে থেকেই এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। চলতি বছর থেকে দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি চুক্তি কার্যকর হওয়াতে কাতার থেকে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বেড়ে বছরে ৬ মিলিয়ন টন হওয়ার কথা রয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ওমানের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি করে থাকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরাসরি না কিনে কেন যুক্তরাষ্ট্রকে রাখতে হলো। কিংবা চাইলেই কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির আরেকটি চুক্তি করতে পারত কি না। এ বিষয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কাতার সফরে গিয়ে তাদের বলেছিলাম আমাদের এলএনজির দাম অত্যন্ত বেশি। তোমরা এলএনজিএর দাম কমাও। তখন কাতার সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, আগের চুক্তির দাম কমানো যাবে না। তুমি একটি নতুন চুক্তি করো, আমরা দাম কমাব।’ সাবেক সরকারের উপদেষ্টার এই বক্তব্য প্রমাণ করে বাংলাদেশ চাইলেই কাতারের সঙ্গে আরও একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করতে পারত। এর মধ্যে অন্য কোম্পানিকে রাখারও কোনো দরকার হতো না।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ বিধানে করা মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনাল বাতিল করে। একই সঙ্গে একই বিধানে করা ৩৪টি সৌর বিদ্যুতের কার্যাদেশ বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু এক্সিলারেট এনার্জির চুক্তিটি বাতিল করা হয়নি কিংবা এটি নিয়ে প্রশ্নও তোলেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
এক্সিলারেট এনার্জি ছাড়াও গত ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে হেডস অব অ্যাগ্রিমেন্ট (এইচওএ) করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এই চুক্তিতে সই করেছেন।
কিন্তু যে আর্জেন্ট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে তারা এখনো কোনো দেশে এলএনজি সরবরাহ শুরু করেনি। আর্জেন্ট এনার্জি তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেছে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ২৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ করার জন্য অবকাঠামো তৈরি করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে তারা ৫ মিলিয়ন টন রপ্তানির জন্য হেডস অব অ্যাগ্রিমেন্ট (এইচওএ) সই করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এনার্জির সঙ্গে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের চুক্তি সই করার বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না জানার জন্য একজন অতিরিক্ত সচিব, একজন যুগ্ম সচিব এবং একজন উপসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এই তিন জনই জানিয়েছেন বিষয়টি তাদের জানা নেই।
বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এতে স্বাক্ষর করেন।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা, এলএনজি সরবরাহ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলএনজি আমদানির জন্য এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে যে চুক্তি রয়েছে, তা এনডিএ বা নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের আলোকে করা হয়েছে। সঙ্গত কারণে আমরা এই দাম বাইরে বলতে পারব না। একইভাবে এক্সিলারেট এনার্জিও প্রকাশ করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে তাতে বলা হয়েছে, আগামী ১৫ বছর বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনতে হবে। অর্থাৎ বছরে বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে এক বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনতে বাধ্য হবে।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সরকার চলে যায় সরকার আসে কিন্তু প্রক্রিয়াগত কোনো পরিবর্তন আসে না। এক্সিলারেট এনার্জির নিজের কোনো গ্যাসক্ষেত্র নেই, তারা মধ্যস্বত্বভোগী। কেন সরাসরি গ্যাস রয়েছে এমন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি না করে মধ্যস্বত্বভোগীর সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।