ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি আগামী ১৯ জুলাই কার হাতে উঠছে? রয়টার্সের করা এক রোমাঞ্চকর বৈশ্বিক সমীক্ষায় অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স। অন্যদিকে, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় 'ফ্লপ' বা হতাশাজনক দল হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। মজার ব্যাপার হলো, এই অর্থনীতিবিদদের মতে—বিশ্বের বর্তমান মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়ার চেয়েও ফুটবলের নিখুঁত হিসাব মেলানো অনেক বেশি কঠিন!
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মহাদেশের ১৬০ জন অর্থনীতিবিদ এই সমীক্ষায় অংশ নেন। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট আর নিত্যনতুন অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস দিতে দিতে ক্লান্ত এই বিশেষজ্ঞদের জন্য প্রতি চার বছর পর পর করা রয়টার্সের এই ফুটবল সমীক্ষাটি ছিল এক দারুণ বিনোদন। এবার তাঁদের দায়িত্ব ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলা; যেখানে প্রথমবার তিনটি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) জুড়ে মোট ৪৮টি দল ১০৪টি ম্যাচে অংশ নিতে যাচ্ছে।
গত ১১ মে থেকে ৫ জুনের মধ্যে পরিচালিত এই সমীক্ষায় ৩৫% ভোট পেয়ে শিরোপার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স। তাদের ঠিক পেছনেই ৩১% ভোট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্পেন। জনপ্রিয় বেটিং প্ল্যাটফর্ম 'পলি-মার্কেট'-এর ট্রেন্ডও প্রায় একই কথা বলছে। যদি এই হিসাব মেলে, তবে বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব আবারও ইউরোপের কাছেই ফিরবে।
দেশমের সামনে ইতিহাস: ফ্রান্স যদি চ্যাম্পিয়ন হয়, তবে ১৯৩৮ সালে ইতালির ভিত্তোরিও পোজোর পর দিদিয়ের দেশম হবেন দ্বিতীয় কোনো কোচ, যিনি টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বেন। একই সাথে ১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে এবং পরে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার অনন্য রেকর্ডের মালিকও হবেন তিনি।
শীর্ষ পাঁচ
ফ্রান্স ও স্পেনের পর অর্থনীতিবিদদের পছন্দের শীর্ষ পাঁচের বাকি তিন দল হলো—বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল এবং ইংল্যান্ড।
লন্ডনভিত্তিক আরবিসি-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি বলেন, '২০২২ সালের ফাইনালের হতাশা ভুলে ফ্রান্স এবার ট্রফি জয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তাদের দলে গত বিশ্বকাপের একঝাঁক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় রয়েছে যারা এখন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন, পাশাপাশি পিএসজির তরুণ প্রতিভারাও যোগ হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, এবার তারা একদম ফ্রেশ ও চনমনে কিলিয়ান এমবাপেকে দলে পাচ্ছে।'
এমবাপ্পে বনাম হ্যারি কেইন ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াই
সমীক্ষায় গোল্ডেন বল (টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়) এবং গোল্ডেন বুট (সর্বোচ্চ গোলদাতা)—দুটি পুরস্কারের জন্যই অর্থনীতিবিদদের প্রথম পছন্দ রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে।
তবে তাঁর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন , যিনি বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সদ্য সমাপ্ত মরসুমে ক্যারিয়ার সেরা ৬১ গোল করে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতেছেন।
এখানে আরও একটি মাইলফলক ছোঁয়ার অপেক্ষা। বর্তমানে বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল ১২টি এবং কেইনের ৮টি। তারা দুজনেই জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার অল-টাইম রেকর্ড (১৬ গোল) ভাঙার পেছনে ছুটবেন। এই তালিকায় ১৩ গোল নিয়ে আছেন লিওনেল মেসিও।
সবচেয়ে বড় ফ্লপ ব্রাজিল, চমক দেখাতে পারে নরওয়ে
অর্থনীতিবিদদের চোখে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ এবার বেশ অন্ধকার। বিখ্যাত কোচ কার্লো আনচেলত্তির আগমনও সেলেসাওদের ওপর বিশেষজ্ঞদের আস্থা ফেরাতে পারেনি।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ফুটবল পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই এবার সবচেয়ে বেশি হতাশ করবে। এই তালিকায় ব্রাজিলের পরেই আছে ইংল্যান্ড ও জার্মানি।
ডার্ক হর্স
ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের দল নরওয়ে এবার বড় চমক দেখাতে পারে বলে মত দিয়েছেন ২১% উত্তরদাতা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫% ভোট পেয়ে এই তালিকায় পরের স্থানে আছে জাপান।
উদীয়মান তারকা
নতুন আলো ছড়াতে পারেন এমন ৪৬ জন ফুটবলারের নাম উঠে এলেও সবার ওপরে আছেন স্পেনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল।
গোল্ডেন গ্লাভস
সেরা গোলরক্ষকের দৌড়ে ফেভারিট ফ্রান্সের মাইক মেইগনান, আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং স্পেনের উনাই সিমন।
অর্থনীতিবিদরা সাধারণত ডেটা বা মডেল নিয়ে কাজ করলেও ফুটবলের ক্ষেত্রে ৭৩% উত্তরদাতাই জানিয়েছেন, তারা কোনো গাণিতিক মডেল নয়, বরং নিজেদের অন্তর্দৃষ্টি বা 'গাট ফিলিং' থেকে এই পূর্বাভাস দিয়েছেন। মাত্র ২০% অর্থনীতিবিদ ডেটা ও গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করেছেন। তবে ৮% ছিলেন ঘোর রোমান্টিক; তারা স্রেফ ভালোবাসার টানে নিজের প্রিয় দলকে বেছে নিয়েছেন, যার মধ্যে দুজন জাপান, একজন মেক্সিকো এবং একজন মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন।