ব্যাংকিং সুশাসনে গণমাধ্যমের বিকল্প নেই : তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা শুধু গণমাধ্যমের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্র ও সমাজে যত বেশি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, তার ইতিবাচক প্রতিফলন ব্যাংকিং খাতেও দেখা যাবে।

রবিবার (৭ জুন) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকখাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বলতা জনসমক্ষে তুলে ধরতে অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম কার্যত ‘ওয়াচডগ’ বা পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করছে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহি ও বস্তুনিষ্ঠতাও বজায় রাখতে হবে। কারণ বস্তুনিষ্ঠতাই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রধান ভিত্তি।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাতে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি ঘটেছে, সেগুলো কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; বরং সামগ্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাই টেকসই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

ব্যাংকিং কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের অন্যান্য সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ব্যাংকিং খাতেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং ব্যাংকিং খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার খানম বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক তদারকি আরও জোরদার করা হচ্ছে।

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মাহমুদুর রশীদ বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও যেসব ব্যাংক সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পেরেছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। মূলত স্বচ্ছতা ও সুশাসনের কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, যখন কোনো রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা সাহসিকতার সঙ্গে জনসমক্ষে তুলে ধরে গণমাধ্যম জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের সংস্কারে কার্যকর নজরদারি, তথ্যের স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমকালের বিশেষ প্রতিবেদক ওবায়দুল্লাহ রনি এবং প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সানাউল্লাহ সাকিব। তারা বলেন, স্বাধীনতার পর ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই দীর্ঘ অর্থনৈতিক যাত্রায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কারণ পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার এখনো অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

তারা বলেন, কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং অর্থ পাচারের ঘটনায় মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার রোধ এবং ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনগণের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। কৃত্রিমভাবে ইতিবাচক চিত্র উপস্থাপন দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।

মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, রিজার্ভ চুরি, বড় ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক দখল, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি উন্মোচিত হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারকদের ওপর জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংক খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা, খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক খাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া ব্যাংক খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর এ ক্ষেত্রে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক গণমাধ্যম হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সহায়ক শক্তি। জনগণের আমানতের সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইমা হক বিদিশা, মো. মাশহিদুল ইসলাম জাহিদ প্রমুখ।