বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে নতুন মোড়

সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসছে। এক মাসও বাকি নেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির বহুল প্রত্যাশিত দ্বিবার্ষিক (২০২৬-২৮) নির্বাচন। ঘোষণা করা অনুযায়ী আগামী ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শিল্পীতে-শিল্পীতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে নতুনদের আনাগোনা। এর মধ্যে গত রোজার ঈদের আগে থেকেই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা স্পষ্ট করেছেন খ্যাতিমান অভিনেত্রী আনোয়ারা বেগমের মেয়ে রুমানা ইসলাম মুক্তি। শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, এরই মধ্যে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা, দেখা-সাক্ষাৎ করে ভোট চাইছেন এই অভিনেত্রী। মুক্তি এর আগে কার্যনির্বাহী পদে নির্বাচিত হলে এবারই প্রথমবার বড় পদে লড়বেন। তার সঙ্গে একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তরুণ চিত্রনায়ক জয় চৌধুরী। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো প্যানেলই চূড়ান্ত হয়নি। পাশাপাশি সময়ের ব্যস্ত ও চাহিদাসম্পন্ন তারকাদের খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না এই নির্বাচন নিয়ে। আবার অনেক তারকা শিল্পীই দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সবমিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে খুব একটা জমবে না ২০২৬ সালের নির্বাচন। সেই সঙ্গে ভোটার উপস্থিতিও হবে প্রতিবারের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম।

এদিকে নির্বাচনে ভেতরে ভেতরে চলছে নানামুখী জল্পনা। ঘটছে নতুন নতুন ঘটনাও। এরই মধ্যে সভাপতি পদে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েও রহস্যজনকভাবে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ। অভিনেত্রী রুমানা ইসলাম মুক্তির সঙ্গে প্যানেল গঠন করবেন বলেও জানিয়েছিলেন রাজ্জাকপুত্র।। তবে শেষ মুহূর্তে এসে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কিছু কারণে এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান এই অভিনেতা। ফলে  নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে এবারের আয়োজন। গত শনিবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) শিল্পী সমিতিসংলগ্ন বাগানে এক সংবাদ সম্মেলনে বাপ্পারাজের সরে যাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানান মুক্তি। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে বাপ্পা ভাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। যে কারণে সাধারণ সদস্যদের আগ্রহে আরমান মামা (অভিনেতা, ফাইট ডিরেক্টর প্রযোজক ও পরিচালক) সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। গুণী শিল্পীদের নিয়ে আমরা সুন্দর একটি প্যানেল চূড়ান্ত করেছি। আমরা নির্বাচিত হলে শিল্পীদের জন্য কাজ করব।’

মুক্তি জানান, মায়ের স্বপ্ন, শিল্পীদের অনুরোধ এবং দীর্ঘদিনের সংগঠনিক অভিজ্ঞতা মিলেই এবার সাধারণ সম্পাদক পদে তিনি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা নির্বাচিত হলে শিল্পীদের যে সব সমস্যা রয়েছে তা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। শুধু কথায় নয়, কাজেও বিশ্বাসী বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘গত দেড় বছরে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে থেকেও অনেক কাজ করেছি। আমরা আগামী দিনেও কাজে প্রমাণ দিতে চাই। আমি নিজেকে শিল্পীদের একটি অংশ মনে করি, আমার দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও শিল্পীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে।’

এর আগে শিল্পী সমিতির কমিটিতে একাধিকবার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন আরমান। সর্বশেষ আরমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলিয়েছেন। এবারই প্রথম সভাপতি পদে লড়তে যাচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে আরমান বলেন, ‘ছোট-বড় সব শিল্পীর আগ্রহে এবার সভাপতি পদে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিগত সময়ে যতবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি শিল্পীরা আমাকে নিরাশ করেননি। এবারও আশা করব তারা আমাকে কাজের সুযোগ করে দেবেন। শিল্পী সমিতি নিয়ে আমাদের বেশকিছু পরিকল্পনা আছে। আমি আর মুক্তি নির্বাচিত হলে শিল্পীদের কল্যাণে তা বাস্তবায়নের জন্য নিরলস চেষ্টা করব।’

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত কিছু কারণে নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না তার। বাপ্পারাজের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার পর সভাপতি পদে শেষ পর্যন্ত কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, তার সিদ্ধান্ত নির্বাচনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে কয়েকমাস আগেই আসন্ন নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন চিত্রনায়ক জয় চৌধুরী।

এ অভিনেতা বলেন, ‘আমি বিগত আট বছর ধরে সমিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছি, আমার জায়গা থেকে শিল্পীদের সেবা করার চেষ্টা করেছি। তাই এবার আমার সিনিয়র-জুনিয়র তারকাদের অনুরোধেই সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করেছি। এবার এমন কিছু ইশতেহার আমরা দেব, যা সত্যিকারেই পূরণ করতে পারব। কোনো মিথ্যা স্বপ্ন দেখাব না। আর আমাদের প্যানেলে তারাই থাকবেন, যারা শিল্পীদের কল্যাণে কাজ করবেন। আমরা চলচ্চিত্রের সংকট কাটিয়ে উঠতে সমিতিকে কার্যকরী ভূমিকায় নিয়ে যেতে চাই। আমি কোনো মিথ্যা আশ্বাস বা স্বপ্ন দিয়ে আমার সদস্যদের বিভ্রান্ত করতে চাই না। অচিরেই আমাদের প্যানেলের চমকগুলোও শিল্পীদের সামনে তুলে ধরব।’

জানা গেছে, মুক্তির প্যানেলে সহসভাপতি পদে লড়ার সম্ভাবনা রয়েছে চিত্রনায়িকা নতুন ও অভিনেতা তুষার খানের। এ ছাড়া এই প্যানেলে আর কারা নির্বাচন করবেন সেটা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেননি সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী মুক্তি। জয় চৌধুরীর প্যানেল অনেকটাই গোছানো। এই প্যানেলের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খল অভিনেতা শিবা শানু। অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেনÑ সহসভাপতি অভিনেত্রী রোজিনা ও অভিনেতা ডি এ তায়েব, যগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুব্রত, সাংগঠনিক সম্পাদক সনি রহমান, অর্থ সম্পাদক জাদু আজাদ, দপ্তর, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেকে আলমগীর, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক পলি, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক কাঁকন। একই প্যানেলে কার্যকরী সদস্য পদে লড়বেন আলীরাজ, রুবেল, ববি হক, ডন, কাবিলা, কায়েস আরজু, শিরীন শিলা, শিপন মিত্র, জলি ও ফিরোজ শাহী। এ প্যানেলের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সিনেমার শিল্পীদের নেতৃত্বে কারা আসতে চাইছেন।

 উল্লেখ্য,আসন্ন এই নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচিত হয়েছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক এবং বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব লিমিটেডের সাবেক সভাপতি কামাল মো. কিবরিয়া লিপু। আর আপিল বোর্ড প্রধান করা হয়েছে একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ছটকু আহমেদকে।