রামিসা হত্যা মামলার রায়

চাই দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি

১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে পৈশাচিক ও বর্বরতার শিকার ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তার দুঃসহ স্মারক। ঘটনাটির পরপরই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে শুভবোধসম্পন্ন মানুষের প্রতিবাদ-প্রতিবিধানের দাবির ঢেউ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছুটে যান শোককাতর পরিবারের সদস্যদের মাঝে। এর আগে রামিসার বাবা মেয়ে হত্যার বিচার চান না এই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের  অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নৃশংসতার বিচার হবে। আশার কথা রাষ্ট্রপক্ষের তরফে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ৭ জুন রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দেশের ইতিহাসে দ্রুততম রায় প্রদানের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, দায়িত্বশীল পক্ষগুলো যথাযথভাবে তৎপর কিংবা নিষ্ঠ হলে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির দুর্নাম ঘুচানো দুরূহ কোনো বিষয় নয়। আমরা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সাধুবাদ জানাই অনন্য নজির স্থাপন করার জন্য। 

বিচার শুরুর ১৯ দিন ও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর তিন কার্যদিবসে রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলার বিচার নিষ্পত্তির এই বিষয়টি নিশ্চয় আগামীর জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। এ মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকিন। অর্থদণ্ডও করেছে আদালত, যা রামিসার পরিবারকে দিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে, এর আগে ২০২০ বাগেরহাটে একটি ধর্ষণ মামলায় বিচার শেষ হয়েছিল চার কার্যদিবসে। ২০২৫ সালে মাগুরায় শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাও শেষ হয়েছিল দ্রুততম সময়ে। কিন্তু এর বিপরীতে বিচারহীনতার পুষ্ট নজিরের দুঃখজনক খতিয়ান অনেক দীর্ঘ এবং সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণ যে তা এটি তর্কাতীত বিষয়।

রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও দ্রুততম সময়ে হবে এ প্রত্যাশা আমরা রাখি। আইনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। আমরা আশা করব অন্য ঘটনারও এমন দ্রুত বিচার হোক এবং উচ্চ আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কার্যকর হোক বিচারের রায়। আমরা স্মরণ করি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ওয়ারেন ই বার্গারকে। তিনি তার এক ঐতিহাসিক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘একটি স্বাধীন জাতির স্বাধীনতার ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে আদালতের ওপর আস্থা অপরিহার্য। আর এই আস্থা তখনই ভেঙে পড়ে, যখন দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষ বিচার বঞ্চিত হয়।’ আমরা মনে করি, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পূর্বাপর তার বাবার ক্ষোভ ও স্বস্তির মধ্যে দিতে এর স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। রামিসার বাবার মতো ইতিপূর্বে আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীর এমন খেদোক্তি আমাদের স্মরণে আছে। স্বজনের বিচার না চাওয়ার অসহায়ত্ব আমরা দেখেছি। একটা রাষ্ট্রে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর কতটা অনাস্থা তৈরি হলে সন্তান কিংবা স্বজনের লাশ সামনে রেখে কেউ এমনটি বলতে পারেন তা ধারণা করা কঠিন কিছু নয়। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিষ্ঠ থাকলে অন্ধকার দূর করা সম্ভব। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মসৃণ হোক তিমির হননের পথ।

রামিসা, মুনতাহা, আয়াতদের তালিকা যেন আর দীর্ঘ না হয়। রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অনুষঙ্গের দায়িত্বশীলদের যথাযথ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জীবনের পথ হোক নিষ্কণ্টক। ‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে / আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই’ এই গীতিকাব্য পঙ্তির আলো ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের স্তরে স্তরে। বাস্তবে রূপ পাক অঙ্গীকার। নিশ্চিত হোক দ্রুত ন্যায়বিচার।