বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে থাকা দায়িত্বশীল অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষক, পেশাজীবী, আইনজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট ও নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আপনাদের উদ্দেশ্যে এই পত্র আমরা প্রেরণ করছি। আপনারা জানেন যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্র্বর্তী সরকার সারা দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে, জাতীয় সংসদ না থাকা অবস্থায় নিজেদের এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ভয়াবহ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। বাণিজ্য চুক্তিটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সেটি জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কারণ এই বাণিজ্য চুক্তির ছত্রে ছত্রে এমনসব ধারা রয়েছে যেগুলো কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধীই নয়, সেগুলো একাধারে আমাদের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রবল হুমকি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের মনে করিয়ে দিতে চাই, নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পররাষ্ট্রনীতিতে যে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছিল, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিটি বহাল থাকলে সেটি হবে তার সরাসরি লঙ্ঘন। আমরা একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদেরও এটা মনে করিয়ে দিতে চাই, যে জুলাই সনদকে আপনারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেন সেই জুলাই সনদে পরিষ্কার বলা ছিল এ ধরনের কোনো চুক্তি করতে হলে তাতে সংসদের অনুমোদন লাগবে। অথচ আপনারা সংসদে এই ভয়াবহ চুক্তি নিয়ে কোনো প্রশ্নই উত্থাপন করেননি। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা থেকে মনে হয় দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের শৃঙ্খল তৈরির এ-রকম কোনো চুক্তি বুঝি আদৌ স্বাক্ষরিত হয়নি। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে আপনাদের এই বিপজ্জনক নীরবতার (স্বতন্ত্র একজন সংসদ সদস্য বাদে) যথাযথ ব্যাখ্যা দাবি করি।
আমরা আপনাদের আরও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার স্বীকৃত নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চাপিয়ে দেওয়া যে রেসিপ্রকাল ট্যারিফ ছিল এই মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপট, খোদ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই রেসিপ্রকাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করায় চুক্তির সেই প্রেক্ষাপটের এখন আর কোনো আইনগত বৈধতা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নেই। ফলে, যে চুক্তির কারণে আমরা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাব, যে চুক্তির কারণে আমরা সামরিক, অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ব, যে চুক্তির কারণে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে, যে চুক্তির কারণে আমাদের কৃষি, ওষুধশিল্প, পোলট্রি, ডেইরি, মৎস্য খাত, রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যে চুক্তির কারণে আমাদের দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিপদে পড়বেন, যে চুক্তির ফলে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতিও ঝুঁকিতে পড়বে, সেই চুক্তি আমরা বাতিল করলে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায় অনুযায়ী এখন আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তি উচ্চশুল্ক বসানোর ক্ষমতা নেই। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতাবলে ১০-১৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে পারলেও তা সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য। এরপরে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এ-ধরনের শুল্কও আর চাপানো সম্ভব হবে না। সুতরাং, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই চুক্তি বাতিল করার পক্ষে অবস্থান নিতে আপনাদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তারপরও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আপনাদের বাধা কোথায় তার ব্যাখ্যাও আমরা দাবি করি।
আমরা এও মনে করি, এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার যে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে সেখানে এ-ধরনের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে কোনো একক পরাশক্তির শৃঙ্খলে বাঁধা পড়লে সেটি আমাদের জন্য প্রবল ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ঝুঁকি এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে। যার ফলাফল সরকার কিংবা বিরোধী দল কিংবা সামরিক বাহিনী কারও জন্যই ভালো হবে না, জনগণের জন্য তো নয়ই। আমাদের দায়িত্ব হবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে সবরকম আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা। বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রেরই অধীনস্ত হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করেনি।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রদূত ‘যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা’র কথা বলেছেন। নিশ্চয় এ ধরনের জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে শুধু রপ্তানি নয় দেশের বাজারের জন্য উৎপাদনও আমরা চাই না। যেমন চাই না জোরপূর্বক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া। তিনি আরও দাবি করেছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই লাভবান হবে। এটা আংশিক সত্য। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ করপোরেট ও সামরিক কৌশলগত স্বার্থে এই চুক্তি যে বিরাট কাজে দেবে তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা কী দেবে? চুক্তি মান্য করলে বাংলাদেশকে বহু পণ্য বাড়তি আমদানি করতে হবে। এসব আমদানি করে বাজারে বিক্রি নিশ্চিত করতে তাতে ভর্তুকি দিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। এগুলোর অনিয়ন্ত্রিত আমদানির কারণে বাংলাদেশের পোলট্রি, ডেইরি, ওষুধশিল্প, ই-কমার্স, কৃষি খাতের লাখ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
শুল্কমুক্ত আমদানির কারণে সংকটগ্রস্ত রাজস্ব আয়ে আরও ঘাটতি হবে। অস্ত্র, বিমানসহ বাধ্যতামূলক অপ্রয়োজনীয় জিনিস আমদানি করতে গিয়ে বিশাল ব্যয়ের বোঝা টানতে হবে। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে; জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ আরও বাধাগ্রস্ত হবে; নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথ কণ্টকাকীর্ণ হবে; দেশের সীমিত গ্যাস সম্পদ রপ্তানির ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশ অন্য দেশের সঙ্গেও স্বাধীনভাবে কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ রকম চুক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অনেক দেশও যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ের পর এই চুক্তির বাধ্যবাধকতাও অকার্যকর হয়ে গেছে। তারপরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা কিছু লোক এই সর্বনাশা কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যতের বহু প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ, গলায় ফাঁস লাগানো এ রকম চুক্তি বাংলাদেশের মানুষ কেন মানবে?
ট্রাম্প প্রশাসন এ-রকম উন্মাদনা কেন তৈরি করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকটের দিকে তাকালে বুঝতে সুবিধা হবে। বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র; জিডিপির প্রায় দেড়গুণ তার ঋণ। প্রায় বছরই এই ঋণ আরও বাড়ানোর জন্য কংগ্রেসে বিশাল দেনদরবার হয়; অর্থের অভাবে শাটডাউন করা হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কেন বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের এই করুণ দশা? কারণ এই দেশের বৃহৎ করপোরেট হাউজের স্বার্থে প্রশাসন যেসব নীতি গ্রহণ করে, ভর্তুকি আর কর মওকুফ করে, তাতে অর্থনীতির ওপর বহু চাপ তৈরি হয়। উপরন্তু প্রশাসন যুদ্ধাস্ত্র খাতে ঋণ করেও বেশুমার অর্থ খরচ করে। সারা দুনিয়া সমরাস্ত্র খাতে যত খরচ করে, তার প্রায় অর্ধেক একা যুক্তরাষ্ট্রই করে। তার ফলাফল দেশে দেশে সামরিক আগ্রাসন, দখল, গণহত্যা। এ সবের খরচ তুলতে গিয়ে ঋণ বাড়তে থাকে।
আমাদের দাবি, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনারা নিজেদের গুরুতর দায়িত্ব আর উপেক্ষা করবেন না এবং জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই এই বাণিজ্য চুক্তি নামের যুক্তরাষ্ট্রের ‘আদেশপত্র’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে (চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের নোটিস দিয়ে) তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এই চুক্তির ফাঁস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করবেন। সেই সঙ্গে আমরা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এ-রকম অসম, অন্যায্য চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল উপযুক্ত তদন্ত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানাই।
এখানেই শেষ নয়। এ বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের কাছে এ খাতে আরও দুই-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধির আর্জি জানিয়েছেন। তাতে এর পরিমাণ হবে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনগণের প্রয়োজনীয় খাত বঞ্চিত করে একক বৃহত্তম ব্যয় বরাদ্দ ধ্বংস খাতে। এ-সবের ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ছেই। আর তা মেটানোর চাপ অন্যান্য দুর্বল দেশের ওপর চাপানোর খায়েশ থেকেই এই উন্মাদনা।
সম্পদ ব্যবহারের এই ধরনের কারণেই এত ক্ষমতাশালী দেশ হয়েও যুক্তরাষ্ট্র কখনো গর্ব করে বলতে পারে না ‘আমাদের দেশে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্যব্যবস্থা আছে।’ ছয় দশক ধরে মার্কিন অবরোধে পিষ্ট হয়েও কিউবা এ কথা বলতে পারে। কিংবা যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারে না ‘আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা, সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে।’ তুলনামূলক অনেক দুর্বল দেশই এ দাবি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ট্রাম্প বরং গর্ব করেন, তার কাছে ধ্বংস ও গণহত্যার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আছে!
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই চুক্তির বিষয় স্থগিত করেছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র নিজে থেকেই শুল্কহার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে তা পুনর্র্নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে।
জাতীয় সংসদের এই অধিবেশনেই উচিত হবে বাংলাদেশকে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত নকশার অধীনস্ত করার এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করা। অধীনতামূলক এই বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতেই হবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়