তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর ওপর ভরসা) ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। এর সম্পর্ক এমন সব বিষয়ের সঙ্গে, যা মানুষ কামনা করে এবং অর্জনের জন্য আগ্রহী থাকে, তা দুনিয়ার বিষয় হোক কিংবা দ্বীনের প্রয়োজন। কিন্তু অনেক মানুষের কাছে তাওয়াক্কুল শব্দটি উচ্চারিত হলে প্রথমেই যে বিষয়টি মনে আসে, তা হলো রিজিক। কারণ সে রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, যে রিজিক আল্লাহ বান্দাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। যেমন তিনি পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জন্য রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়।’ (সুরা হুদ ৬) অপর স্থানে তিনি বলেন, ‘এমন অনেক জীবজন্তু আছে, যারা নিজেদের খাদ্য মজুদ রাখে না, আল্লাহই তাদের রিজিক দান করেন আর তোমাদেরও। তিনি সব কিছু শোনেন, সব কিছু জানেন।’ (সুরা আনকাবুত ৬০)
আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে সাধকের সামনে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আসে, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তার ‘মিনহাজুল আবিদিন’ গ্রন্থে সেগুলোর আলোচনা করতে গিয়ে সর্বপ্রথম রিজিকের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এবং এর সমাধান হিসেবে তাওয়াক্কুলের কথা বলেছেন।
নিঃসন্দেহে রিজিকের বিষয়টি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা তাদের ব্যস্ত ও চিন্তাগ্রস্ত করে রাখে। যেমন তাদের ব্যস্ত রাখে মৃত্যুর বিষয়টিও। কিন্তু যারা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তারা এই দুটি বিষয় থেকে নিজেদের মনকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়। কারণ তারা নিশ্চিত থাকে যে, রিজিক বণ্টিত এবং আয়ু নির্ধারিত। কেউ তাদের রিজিক থেকে একটি দানা পরিমাণও কমাতে পারবে না এবং তাদের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে মৃত্যু হবে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ রিজিকের জন্য চেষ্টা-সাধনা পরিত্যাগ করবে। বরং সে কাজ করবে, পরিশ্রম করবে এবং উপার্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাবে। কিন্তু তার অন্তর থাকবে প্রশান্ত। সে জানবে, অন্য কেউ তার রিজিক ভোগ করতে পারবে না, যেমন সেও অন্যের রিজিক ভোগ করতে পারবে না। তার জন্য যা নির্ধারিত হয়েছে, তা কখনো তার হাতছাড়া হবে না। আর যা তার জন্য নির্ধারিত নয়, তা কখনো তার ভাগ্যে আসবে না।
জাহেলি যুগের আরবরা এ সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। ফলে তারা এক ভয়াবহ অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। তারা নিজেদের সন্তানদের নিজ হাতে নির্মমভাবে হত্যা করত। এর পেছনে ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটি কারণ। কখনো বিদ্যমান দারিদ্র্যের কারণে, কখনো সম্ভাব্য দারিদ্র্যের আশঙ্কায়। অর্থাৎ তারা ভয় করত, সন্তানরা তাদের সঙ্গে খাবারে অংশ নেবে এবং তাদের রিজিকের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অথচ তারা বুঝতে পারেনি যে, সন্তানদের রিজিকও তাদের সঙ্গে সঙ্গেই আসে।
মহান আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যেসব বিষয় হারাম করেছেন, সেগুলোর প্রসঙ্গে বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কোরো না। আমি তোমাদেরও রিজিক দিই এবং তাদেরও।’ (সুরা আনআম ১৫১)
ইসলাম এই জঘন্য অপরাধের মূলোৎপাটন করেছে। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে, আল্লাহই মহান রিজিকদাতা, শক্তির অধিকারী ও পরাক্রমশালী। তার ভাণ্ডার পূর্ণ, কখনো নিঃশেষ হয় না।
আততাওয়াক্কুল গ্রন্থ থেকে ভাষান্তর করেছেন মুহসিনা জামান