এক উপজেলাতেই ৭০০ কোটি টাকার লিচু

লিচুর রাজধানীখ্যাত ঈশ্বরদী এখন পাকা লিচুর রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। ঈশ্বরদী পৌরসভাসহ ৭টি ইউনিয়নের যেদিকে দৃষ্টি যায় শুধু লাল টসটসে রঙিন লিচু আর লিচু। গত বছরের তুলনায় এ বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বৃষ্টিও হয়েছে সময়মতো। এ জন্য গাছে গাছে লিচুর প্রচুর মুকুল ধরলেও তা রয়ে গেছে গাছেই। দামও বেশ ভালোই পাচ্ছেন লিচুচাষিরা।

এই এক উপজেলাতেই ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশা করছেন কৃষকরা।

লিচু আবাদের কারণে অনেক ব্যক্তির নামের আগে যোগ হয়েছে ‘লিচু’ শব্দটি। এদেরই একজন আব্দুল জলিল কিতাব ম-ল। তিনি লিচু কিতাব নামেই পরিচিত। কয়েক বছর আগে তিনি লিচু চাষের জন্য জাতীয় কৃষি পদক পান। লিচু কিতাব জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। দামও বেশ ভালো পাচ্ছেন লিচুচাষিরা। গত বছর লিচুর ফলন বিপর্যয়ের কারণে কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছিল তা এ-বছর পুষিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত বছর ফলন কম হলেও দাম ছিল তুলনামূলক বেশি। তিনি আরও বলেন, তার তিনটি বাগান মিলে ২শ লিচুগাছ রয়েছে। গত বছর লিচুর ফলন তেমন না হলেও এ-বছর প্রায় প্রত্যেকটি গাছেই বেশ ভালো ফলন হয়েছে। গত বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করলেও এ বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারব বলে মনে হচ্ছে। তার বাগানে উৎপাদিত লিচু ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই পাঠানো হয়। সব চেয়ে আশার কথা হলো, ঈশ্বরদীর উৎপাদিত লিচু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে পাঠানো হয়। সেসব দেশেও ঈশ্বরদীর উৎপাদিত লিচুর বেশ সুনাম রয়েছে।

হরেক জাতের লিচু

ঈশ্বরদীতে আবাদকৃত লিচুর মধ্যে আঁটি লিচু, চায়না-তিন চার, বেদানা, বোম্বাই লিচু উল্লেখযোগ্য। ঈশ্বরদীর সাহাপুর, ছলিমপুর, দাশুড়িয়া, মিরকামারী, ছিলিমপুর, জয়নগর, মানিক নগর, ভাড়ইমারী, বক্তারপুর, জগন্নাথপুর, শেখেরদাইড়সহ প্রায় সব এলাকাতেই মাটির উর্বরতার কারণে লিচু সুস্বাদু ও উন্নতমানের হয়ে থাকে। অন্যান্য এলাকার চেয়ে এখানকার লিচু দেশি-বিদেশি সব ধরনের ক্রেতার কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মৌসুমের শুরুতেই ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে আগাম বাগান কিনে নিজের সন্তানের মতো পরিচর্যা করায় প্রতিটি বাগানেই বাম্পার ফলন হয়েছে। কোলেরকান্দি এলাকার লিচুচাষি আহমদুল্লাহ্ মিলন জানান, তার লিচুর বাগানে গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি লিচু হয়েছে। দাম ভালো হওয়ায় গত বছরের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গত বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর ফলন তেমন ভালো না হলেও এ বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে লিচুর ফলন বিপর্যয় হলেও এ বছর সেই ক্ষতি পুষিয়ে যাচ্ছে লিচুচাষিদের। বর্তমানে লিচুতে জমজমাট হয়ে উঠেছে ঈশ্বরদীর অর্থনীতি।

ঈশ্বরদী কৃষি অফিস জানায়, এ বছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ঈশ্বরদীতে। বিগত সময়ে ঈশ্বরদীতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। প্রতি বছরই চাষিরা অন্য আবাদ কমিয়ে লিচু চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। চলতি বছর ঈশ্বরদীতে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। গত বছর শতকরা ৩০ ভাগ গাছে লিচু ধরলেও এ বছর প্রায় ৯০ ভাগ গাছে প্রচুর মুকুল ধরেছে। মুকুল এবং গুটির সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। ঈশ্বরদীর প্রতিটি বাগানে বাতাসে দোল খাচ্ছে থোকায় থোকায় লাল রঙের পাকা রঙিন লিচু।

নানা কারণে গত তিন বছর লিচু নিয়ে ঈশ্বরদীর হাজার হাজার লিচুচাষি চরম বেকায়দায় পড়েছিলেন জানিয়ে মানিকনগর গ্রামের লিচুচাষি আব্দুল হক জানান, তার তিনটি বাগান থাকা সত্ত্বেও তিনি আরও দুটি বাগান কিনেছেন। তার ৫টি বাগানে মোট লিচুগাছের সংখ্যা প্রায় ২শ। তিনি প্রায় ২০ লাখ লিচু বিক্রি করবেন বলেও জানান। সব কিছু অনুকূলে থাকলে এবার বেশ লাভ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। চরমিরকামারী গ্রামের লিচুচাষি হাবিবুল ইসলাম মালিথা জানান, তার বাগানেও একই অবস্থা। গত বছর লিচুর ফলন বিপর্যয় হলেও এবার বেশ বাম্পার ফলন হয়েছে। লিচুর আবাদের ওপর ভিত্তি করেই তার সংসার চলে জানিয়ে এবার লিচুর ফলন ভালো হওয়ায় আগামী বছর তার পরিবার নিয়ে বেশ ভালো যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

লিচু কেনার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, ভোলা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ব্যাপারী ও পাইকার এসেছেন ঈশ্বরদীতে। তারা বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, লিচুচাষির বাড়িতে থেকে লিচু কিনে চলে যাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন। লিচু কেনা-বেচার জন্য ঈশ্বরদীর জয়নগর শিমুলতলা, বোর্ড অফিস মোড়, দাশুড়িয়া, আওতাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় লিচু হাট বসে। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে জমজমাট কেনা-বেচা। ক্রেতা-বিক্রেতার পদভারে মুখরিত হয় হাট এলাকা। আবার লিচুগাছ থেকে পেড়ে তা বাছাই করার জন্যও লিচুচাষিদের বাড়িতে এখন আত্মীয় স্বজনদের প্রচন্ড ভিড়। মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিদের পদভারে মুখরিত লিচুচাষির বাড়ির আঙিনা।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন জানান, লিচু আবাদ সহজলভ্য হওয়ায় প্রত্যেক বছরই এখানে পেশাদার লিচুচাষির বাইরেও কিছু কিছু মানুষকে লিচু চাষ করতে দেখা যাচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এবার ঈশ্বরদীতে প্রায় ২০০ হেক্টর বেশি জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ঈশ্বরদীতে। শেষ পর্যন্ত টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ঈশ্বরদীতে এ মৌসুমে মোট প্রায় সাড়ে ৭ লাখ গাছের মধ্যে শতকরা ৮০/৮৫ ভাগ গাছে লিচুর উৎপাদন হয়েছে। এতে ঈশ্বরদী এলাকায় এবার প্রায় ১২ হাজার কৃষক ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের আশা করছেন।